ঢাকারবিবার , ৫ মে ২০২৪
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

শূন্যের একাকীত্ব

মৃধা প্রকাশনী
মে ৫, ২০২৪ ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বড়ভাইয়ের পরামর্শে একটু দূরেই মেসে উঠেছিলাম। একেবারে বন্ধুহীন, মেসের একমাত্র ভার্সিটিপড়ুয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ক্লাসে যাতায়াত করতাম। ক্লাস ব্যতীত নিচেও নামতামনা। রুমমেট কারমাইকেল’এ এমবিএ পড়ুয়া সুদর্শন মিজানভাই। একজন ভালো ক্রিকেটারও বটে। ভাই প্রায় বাইরেই থাকত, রুমে সারাক্ষণ আমি একাই থাকতাম, কারো সাথে কথা হতোনা, ২১১নং রুমের বাইরে ৩০৬নং আরিফ ভাইয়ের কাছে যেতাম। পরে তার রুমেই উঠেছিলাম। ভীষণ অমায়িক ছিল উনি। সাপ্তাহিক ছুটিভিন্ন অন্যান্য ছুটিতেও বাড়িতে যেতাম। কিছুদিনপর কোভিড শুরু হয়। বাড়িতে চলে যাই। ২০২১সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে এসে দেখি, আমার সিটে ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া নতুন একটা ছেলে উঠেছে, নাম তার ‘তাছকিলুন ইসলাম রাব্বি’, ‘তাছকিলুন’ নামটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়, একদম ইউনিক কিন্তু তার ইচ্ছেতেই তাকে ‘রাব্বি’ নামে ডাকতাম। কয়েকদিন গেস্ট হিসেবে থেকে পরে ৩১৪তে একটা সিট ফাঁকা হলে সেখানে উঠি। আমার বেড, জানালা এবং ৩০৬এর দরজা, রাব্বির বেড প্রায় সমান্তরাল।
প্রথমে রাব্বি, সাথে তার ফুফাতো ভাই অর্পন (সেও একইসাথে কারমাইকেলে পড়ে), রায়হান (গভঃ সিটি কলেজ) এর সাথে সখ্যতা হতে থাকলো, যাদের সাথে বয়সের পার্থক্য প্রায় ৩বছর। ছোটবেলা থেকে সহপাঠী, বন্ধুদের থেকে অসংখ্যবার অপমানিত, প্রত্যাখ্যাত, অবহেলিত হয়েছি, সবাই ছেড়ে গেছে। প্রতিজ্ঞা করেছি কখনো ভালো বন্ধুত্ব করবনা,দূরত্ব বজায় রাখব।
কিন্তু রাব্বিদের ক্ষেত্রে সেটা ধরেরাখা সম্ভব হয়নি, অজান্তেই মনের ভিতর ঢুকে পুরোটাই দখলে নিয়েছে বুঝতেই পারিনি।
মোর্শেদভাই, কবিরভাই, বিপুভাই, রোকনভাই সোহেলভাইকে কোভিডের আগে থেকে চিনলেও তুষার, মাইদুল, মিনু, আতাউর, মারুফ, সৈকত, আকাশ, ফাহাদ্দিস, খালেকভাই, শিশিরভাইদের সাথে পরে পরিচয় হয়।
রাব্বি, রায়হান, অর্পনদের কাছে ধীরেধীরে ‘মোস্তফাভাই’ হয়ে উঠলাম, রাব্বি ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’, অর্পন থেকে ‘অপু’ হয়ে উঠল। মেসে সবার কাছে পরিচিত মুখ হতে থাকলাম।
৪জনের গড়ে উঠল অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। ৪জন সবসময়ই একত্রে থাকতাম। সবার কাছে স্নেহ, সম্মান পেতে থাকলাম। ৪জনের একজনও মিসিং থাকলে মেসের ভাইয়েরা বলতো আরেকজন কোথায়? সবাই বলে আমি নাকি দেখতেও ওদের বয়সী, অবশ্য রায়হান,অপুকে আমার থেকে বেশি সিনিয়র দেখায়।
খুব হাসাহাসি, খুনসুটি করতাম, সবখানে ৪জন একসাথেই যেতাম। আমি ক্লাস বা কাজ ব্যতীত একমিনিটও বাইরে বিলম্ব করতামনা। কোথাও না জানিয়ে গেলে বা ফিরতে দেরী হলে ফোন দিয়ে বা ফিরলেই জবাবদিহি করতে হতো কেন না বলে গেলাম?, কেন ফিরতে দেরী হলো?, কি করলাম?, কোথায় গেছিলাম? ইত্যাদি। ওরাও যাওয়ার আগে আমাকে জানিয়ে যেত আবার ফিরেই আমার দরজায় হাজিরা দিত।
বাড়িতে গিয়েও থাকতে পারতামনা, ঈদের লম্বা ছুটিও অতি সংক্ষিপ্ত করে ফেলতাম। মা ওদের জন্য আলাদাকরে খাবার পাঠাতো, ওদের মায়েরাও পাঠাতো। মায়েদের পাঠানো ভালোবাসা আমরা একসাথে বসে ভাগ করে খেতাম।
কাছাকাছি থাকতে চাইতাম বিশেষত রাব্বির, সেজন্য নির্লয়, তালহা, টিটুভাই, শয়ন, নাফিস, রাকিবভাই, সোহেল রুমমেট পরিবর্তন হলেও আলো-বাতাসহীন ভ্যাপসা ৩১৪নং ছেড়ে যাইনি।
মায়া কাটানোর জন্য ভার্সিটির কাছাকাছি মেসে গেছিলাম কিন্তু ৪দিন পরই ফেরত এসেছিলাম, ৪দিন নয় যেন ৪ বছর। বুঝেছিলাম একই শহরে ভিন্ন জায়গায় থাকা অসম্ভব।
অপু এইচএসসি’র সময় ৩১০নং ছেড়ে অন্য মেসে গেলেও অ্যাডমিশনের সময় ফিরে এসে ৪১২তে উঠলো, রাব্বি ৩০৬ থেকে ৪০৩এ, আরও সখ্যতা বেড়ে গেল।
মান অভিমান অনেকবার হয়েছে কিন্তু প্রত্যেকবারই আরও বেশিকরে অনুভব করেছি আরও বেশিকরে কাছাকাছি আসা হয়েছে, আরও বেশি ভালবাসা বেড়ে গেছে।
রাব্বি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল, রায়হান জগন্নাথে অপু কোথাও না পেলেও ৩জনই মেস ছেড়ে চলেগেল, ভীষণ একাহয়ে গেলাম। স্মৃতিমাখা ৩১৪ ছেড়ে রায়হানের সিটে(৩১১) উঠলাম,দেয়ালে রায়হানের লাগানো মানচিত্র, স্টিকি অমনই থাকলো।
মেসে দমবন্ধ লাগে বাইরেগেলে ফিরতে ইচ্ছে করেনা বাড়িতে গেলে মা আসতে দেয়না, বারবার বলে একা কিভাবে থাকবি?
কনক, শয়ন, মশিউর, বাপ্পি, সামিউল, রেজোয়ান, সাঈদ, সামিউনরা আমাকে সঙ্গ দিতে শুরু করলো। একাকীত্ব কাটানোর বৃথা চেষ্টা করতে থাকলাম, একটা বিড়ালের বাচ্চা আনলাম, বাপ্পির সাথে মেসে বিভিন্ন ফুলগাছ লাগালাম। একদিন বিড়ালটাও হারিয়ে গেল। বাপ্পি ঢাকা যাওয়ায় গাছগুলোও অযত্নে বিবর্ন হতে থাকল। অপু, শোয়েব সেকেন্ডটাইম করার জন্য ৪০২ ও ৪০৬এ উঠলো।
অ্যাডমিশন শেষ হওয়ার আগেই কনক শয়নরা মেস ছেড়ে গেল। মশিউর ও চলে গেল ওর আম্মা অসুস্থ জন্য। এখন শুধুমাত্র সোহেল, সাব্বির, উৎসব, রতন, দেবাশীষরা আছে, আমার এমএসএস শেষ হওয়ার আগে ওরাও চলে যাবে। পুরোনোদের মধ্যে কয়েকজনছাড়া সবাই চলেগেছে আমি আছি একা, একদম একা, ভীষণ… একা। ওদের ছাড়া আমি একেবারে শূন্য, আর ওরা না থাকলে শুরু হয় শূন্যের একাকীত্ব।

এখন আর আড্ডা হয়না, গানের আসর হয়না, বিকেলে নাশতা, মধ্যরাতে চা কিংবা আইসক্রিম খেতে যাওয়া হয়না, ঘুরতে যাওয়া হয় না, কেউ কাউকে পঁচায় না, গল্প হয় না প্রাণখুলে, দুঃখ-বেদনার অনুভূতি শেয়ার করা হয় না, খুব করে হাসাহাসি করা হয়না, মান-অভিমান করা হয় না, রাগ ভাঙানো হয় না, টিভি রুমে যাওয়া হয়না, দাবা তাস খেলা হয় না, ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধূলা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয় না…… এককথায় বলতে গেলে সবার সব হয়, আমাদের কিছুই হয় না।

জিএমকে শেখ
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial