ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

বসন্ত বিলাস

ঋতু দে
ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৪ ১:০৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আজ পহেলা ফাল্গুন।
প্রকৃতি আবার নতুন সাজে সেজেছে।কোকিলের কুহু কুহু ধ্বনি জানান দিচ্ছে বসন্তের আগমনী বার্তা। গোটা শহর আজ উৎসবে মেতেছে বসন্তের আগমনে। একদল তরুণ-তরুণী বাসন্তী রঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিলো। ফাল্গুনী বারান্দায় বসে দেখছে সেই দৃশ্য গুলো।সারা শহর উৎসবে মেতে উঠলেও আজ তার মন বিষন্ন। হঠাৎ সেই তরুণ-তরুণীর দলের মধ্যে একজোড়া কপোত-কপোতীর দিকে দৃষ্টি আটকে গেলো ফাল্গুনীর। ছেলেটি দোকান থেকে পলাশ ফুলের মালা কিনে তার প্রেয়সীর খোঁপায় পরিয়ে দিচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে হঠাৎ ফাল্গুনীর সেই পুরোনো সাত বছর আগের স্মৃতি ভেসে উলো চোখের সামনে।

সপ্তাহ দু’য়েক হলো ফাল্গুনীর ভার্সিটির প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হলো। আজ ক্লাসে ম্যাম আগত পহেলা ফাল্গুন উৎসবের পরিকল্পনা জানালেন। নাচ,গান,আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের নাম জমা দিতে বললেন। ফাল্গুনী খুব ভালো গাইতে জানলেও লাজুক স্বভাবের কারণে নাম জমা দিতে সাহস পেলো না। অবশেষে পহেলা ফাল্গুনের সেই দিন হাজির। ফাল্গুনী সেইদিন দর্শক সারিতে প্রথমের দিকেই বসেছিলো। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মঞ্চে গান গাইতে উঠলো পলাশ। একের পর এক অসাধারণ গান গেয়ে পুরো অডিটোরিয়ামকে মাতিয়ে রেখেছিলো সেইদিন। হঠাৎ তার কানে একটি মেয়ের মিষ্টি গলার স্বর ভেসে এলো। মেয়েটি তার সামনেই বসে আছে। পলাশ মাইক্রোফোনটি ফাল্গুনীর দিকে এগিয়ে দিলো। ফাল্গুনী সেই সময় জড়তা কাটিয়ে পলাশের সাথে গলা মিলিয়ে গাইতে লাগলো, ” মুক্তা যেমন শুক্তির বুকে তেমনি আমাতে তুমি/ আমার পরাণে প্রেমের বিন্দু তুমি শুধু তুমি।”

সেইদিন অনুষ্ঠান শেষে ফাল্গুনী অডিটোরিয়াম ছেড়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাওয়াতে তার সাথে আর পরিচয় হওয়ার সুযোগ হলো না। পলাশের চোখে শুধু এটুকুই ভাসছিলো, ফাল্গুনীর খোঁপায় ছিলো পলাশ ফুলের মালা। অপূর্ব স্নিগ্ধ লাগছিলো মেয়েটিকে। পরবর্তীতে অনেক বার দেখা হয়েছিলো ঠিক, কিন্তু ফাল্গুনী দূর থেকেই হেসে চলে যেত তাই পলাশের ও সাহস হতো না বেশি কথা বলার। প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করার পর ফাল্গুনী ধীরে ধীরে জড়তা, সংকোচ কাটিয়ে কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে লাগলো। অবশ্য তার এই জড়তা কাটানোর জন্য বান্ধবী স্নেহার অবদানই বেশি। ফাল্গুনী যতটা লাজুক স্বভাবের স্নেহা ঠিক তার বিপরীত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর পূর্বে যখন ফাল্গুনী ও স্নেহা রিহার্সেলে যেতো সেইসময় পলাশ ও ফাল্গুনীর টুকিটাকি কথাবার্তা চলতো। পলাশ ফাল্গুনীদের সিনিয়র ব্যাচ। এইভাবে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত কথা বলা শুরু হলো। একদিন কথার ছলে ফাল্গুনীকে জিজ্ঞেস করলো পলাশ, “তুমি এত ফুলের মধ্যে ফাল্গুন উৎসবের দিন পলাশ ফুলের মালা কেনো পরেছিলে খোঁপায়? “
ফাল্গুনী : “কারণ পলাশ ফুল খুব ভালোবাসি।”
এরপর থেকে প্রতি বছর বসন্ত উৎসবে পলাশ নিজ হাতেই পলাশ ফুলের মালা গেঁথে ফাল্গুনীর খোঁপায় পরিয়ে দিতো। সময় গড়িয়ে যেতে লাগলো। এইভাবে পলাশ আর ফাল্গুনীর মধ্যে পরিচয় থেকে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠলো।

পলাশ গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি নিলো। কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও ফাল্গুনীর সাথে দিন শেষে কথা না হলে পুরো দিনটিই অসম্পূর্ণ মনে হতো তার। ফাল্গুনীর গ্র্যাজুয়েশনের পর পরিবার থেকে যখন বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো ফাল্গুনী ভয়ে ভয়ে জানালো পলাশের কথা। ফাল্গুনীর বাবা প্রথমে নারাজ ছিলেন। কিন্তু পলাশ আর তার পরিবারের প্রচেষ্টায় সম্পর্কটি প্রণয় থেকে পরিণয়ে রূপ পেয়েছিলো।
বিয়ের প্রথম দু’বছর বেশ আনন্দেই কেটে গেলো তাদের। কিন্তু এরপর যতই দিন যেতে লাগলো তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে লাগলো। পলাশ আজকাল অফিস থেকে ফিরে ফাল্গুনীর সাথে প্রয়োজন ব্যতীত তেমন একটা কথা বলে না। প্রায় কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ফাল্গুনী অবশ্য দু’একবার জানতে চাইলেও পলাশ এড়িয়ে গিয়েছিলো বিষয়টি। সেইসময় পলাশের কর্মস্হলে একদল প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়ে পলাশকে চাকরিচ্যুত করার জন্য আদাজল খেয়ে লাগলো। অবশেষে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার চিঠি হাজির।

“কি করবে পলাশ এখন?কোথায় গিয়ে ঠাঁই হবে এই শহরে?বৃদ্ধ মাকে এবং ফাল্গুনীকে কি জবাব দিবে?” জমানো সঞ্চয় সব বাবার কিডনি ডায়ালোসিস এর চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেলো। এই সব বিষয় চিন্তা করতে করতে বন্ধু প্রীতিশের কাছে বললো সব। কিন্তু ফাল্গুনীকে কিছু না জানানোর জন্য অনুরোধ করলো। এরপর পলাশের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কোম্পানিতে ছুটাছুটি শুরু হলো। না, কোথাও কোনো পদ খালি নেই। সপ্তাহখানেক পরেই তাদের তৃতীয় বিবাহবার্ষিকী। ফাল্গুনী পলাশকে সারপ্রাইজ দিয়ে চমকে দিবে বলে আগে থেকে কিছু জানায়নি। কিন্তু সেইদিন সকাল থেকেই পলাশকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিলো। কারণ আজ প্রীতিশের এক বন্ধুর প্রতিষ্ঠান থেকে চিঠি আসার কথা। ফাল্গুনী আজও চিন্তার কারণ জানতে চাইলে পলাশ প্রতিবারের মতো এড়িয়ে যায়। পলাশ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে প্রীতিশের বাসায় গিয়ে উঠলো সন্ধ্যার দিকে। প্রীতিশ এখন ও বিয়ে থা করেনি। মেসে থাকে। তাই যখন তখন তার বাসায় আসা যায়। এইদিকে সন্ধ্যার পর থেকেই একের পর এক ফোন দিয়েই যেতে থাকে ফাল্গুনী। সে আজ খুব সুন্দরভাবে আয়োজন করেছে পলাশের জন্য। অনেক দিন হয়ে গেল, পলাশের সাথে একান্তে কিছু সময় বসে কথাও বলা হয় না। পলাশ ও ভেবেছিলো, আজ চাকরিটা হয়ে গেলে ফাল্গুনীকে সব কিছু জানাবে। “কিন্তু তা আর হলো কোথায়?”, এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে ফোন রিসিভ করে রাগের মাথায় বললো, “আমাকে মুক্তি দাও ফাল্গুনী,বিরক্ত কোরো না।” এই কথা বলে ফোন বন্ধ করে সেইদিনের সেই রাতটা সে প্রীতিশের বাসায় কাটিয়ে দিলো। এইদিকে ফাল্গুনী অভিমান করে কান্না করতে করতে ভাবতে লাগলো-অনেক হয়েছে,আর নয়। এইবার সত্যিই সে পলাশকে মুক্তি দিবে।

পরদিন ভোরেই সে তার দুঃসম্পর্কের এক বোনের বাসায় গিয়ে উঠলো। এইদিকে পলাশ ফাল্গুনীকে ঘরে ফিরে দেখতে না পেয়ে সব দিকে তন্ন তন্ন করে খোঁজ নিতে লাগলো। ফোন ও বন্ধ। দিন পনেরো চলে যাওয়ার পর অবশেষে স্নেহার মাধ্যমে ফাল্গুনীর খোঁজ পাওয়া গেলো। কিন্তু সেই ঠিকানায় গেলেও ফাল্গুনীর সাথে দেখা করার সুযোগ মিললো না। অনেক বার চেষ্টা করেও পলাশ ব্যর্থ হয়েছিলো। ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করার পরও ফাল্গুনী কখনোই সামনে আসতো না।

এইভাবে মাস চা’রেক কেটে যায়। কয়েকদিন হলো পলাশ নতুন আরেকটি কোম্পানিতে চাকরি পেল। এর মধ্যেই ফাল্গুনীর কাছ থেকে ডিভোর্স পেপারের নোটিশ আসে। পলাশ নিজের সব ভুল বুঝতে পেরে প্রতিনিয়ত আফসোস করছিলো, কিন্তু ফাল্গুনীকে বুঝিয়ে বলার সুযোগই হয়ে উঠছিলো না। কারণ ফাল্গুনী যে বড্ড অভিমানী। আগামী ১৪ই ফেব্রুয়ারি মিউচুয়ালি ডিভোর্স পেপারে সাইন করার দিন ধার্য হলো।
পুরোনো সব স্মৃৃতি মনে পড়ায় অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল ফাল্গুনীর। হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে সম্বিৎ ফিরে এলো। দরজা খুলে পলাশকে দেখে অবাক হলেও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো না ফাল্গুনী।
পলাশ: “দ্রুত তৈরী হয়ে নাও ফাল্গুনী। একসাথেই যাবো।”
“আমি একাই যেতে পারবো।” ফাল্গুনী প্রত্যুত্তরে শুধু এইটুকুই বললো।
ফাল্গুনী আজ সুন্দর করে সেজেছে। পরেছে পলাশের উপহার দেওয়া প্রথম শাড়িটি। কারণ আজ শেষবারের মতো পলাশের সাথে দেখা হচ্ছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই নিউইয়র্কে চলে যাবে মা আর ছোটবোনের কাছে। বাবা গত হয়েছেন বছরখানেক হলো। পলাশ অবশ্য সেসব কিছুই জানে না। ফাল্গুনীকে দরজার আড়াল থেকেই দেখছিলো পলাশ। আজ ফাল্গুনীকে দেখতে সেই প্রথম দিনের অডিটোরিয়ামে দেখাতে যেমনটা লেগেছিলো ঠিক তেমনটাই লাগছে পলাশের। পলাশের হাতে পলাশ ফুলের মালা। পলাশ গুনগুন করতে করতে দরজার আড়াল থেকে ফাল্গুনীর কাছে এগিয়ে গেল, “তুমি যে ফাগুন/রঙের ও আগুন/তুমি যে রসের ও ধারা/তোমার মাধুরী তোমার মদিরা করে মোরে দিশাহারা…” ফাল্গুনীও হঠাৎ আনমনে একসাথে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠলো, “মুক্তা যেমন শুক্তির বুকে/তেমনি আমাতে তুমি/আমার পরাণে প্রেমের বিন্দু /তুমি শুধু তুমি…”। গান গাইতে গাইতে ফাল্গুনীর খোঁপায় পলাশ ফুলের মালা পরিয়ে দিলো। তারপর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সব কথা খুলে বললো পলাশ। সবকিছু শুনে ফাল্গুনী আবারো একটু অভিমান করলেও পলাশের ভালোবাসার কাছে অভিমানগুলো হার মেনেছিলো সেইদিন।
এভাবেও ফিরে আসা যায়.

কার্টুন: AmitToonz
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial