ঢাকামঙ্গলবার , ৩০ জানুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

মহাবিদ্যালয়ের দিনগুলি

মৃধা প্রকাশনী
জানুয়ারি ৩০, ২০২৪ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

আমি ও আমার দুই বন্ধু শৈশব থেকেই একসাথে পড়াশোনা করছি। মফিদুল, শিমুল ও আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হবার পর এবার একই কলেজে ভর্তি হলাম।এই সময় চিন দেশে একটি নতুন ভাইরাসের কারণে মহামারি দেখা দেয়। যা পরে অতিদ্রুত  সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত করোনা নামক এই ভাইরাস প্রতিটি দেশের গ্রামে-গঞ্জে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। শুধু আতঙ্কই নয় বরং এই ভাইরাস অন্যান্য ভাইরাসের থেকে অতিদ্রুত একজনের থেকে অন্য জনের শরীরে সংক্রমিত হয়।এই ভাইরাসের ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে, খুব দ্রুত মানুষ আক্রান্ত হয়ে কিছু মানুষ ভাইরাস থেকে মুক্ত পেলেও কিছু মানুষ মারাও যায়। তবে কোন কোন ব্যাক্তির শরীরে এই ভাইরাস একের অধিক বারও সনাক্ত হতে দেখা যায়। এমন মহামারি কালে আমরা কলেজে ভর্তি হই। ভর্তি হওয়ার পর থেকে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও এই ভাইরাসের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে। এমন সময় কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তিন সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে প্রধানমন্রী, সেই সাথে সবাইকে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেইনটেইন করতে বলে।

আগে মানুষ মুখে মাস্ক ব্যবহার করত খুবই কম কিন্তু এই ভাইরাস সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিটি মানুষের মুখে মাস্ক পড়তে দেখা যায়। এই ভাইরাস যেহেতু একজনের দেহ থেকে অন্য জনের দেহে ছড়িয়ে পড়ে তাই সভা,মিছিল, মিটিং, বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান এই সমস্ত কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রবাসী বাংলাদেশি ভাইয়েরা যদি বাসায় আসে তাহলে তাহলে তাদের জন্য আলাদাভাবে দুই সপ্তাহ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনও কিছু দেখা গেছে যে মানুষ যখন মারা যায় তখন তাকে কবরে রাখার কোন মানুষ পাওয়া যায় না। কবর খুঁড়ে যে মাটি দিবে এমন মানুষ না পাওয়ার কারণে গাড়িতে করে নদীতে ভাসায় দেওয়া হয়েছিল কিংবা অনেক বড় মেশিন এর সাহায্য মাটিতে গর্ত করে অনেক মানুষ কে এক জায়গায় রাখা হয়েছিল। নিজের পিতা মারা গেলেও সন্তান তাকে শেষ বারের মতোও দেখতে যাইতো না এই ভাইরাসের আতঙ্কে।

সমাজটাকে পুরো এলোমেলো বানিয়েছিলো এই ভাইরাস।এই করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত প্রতিটি দেশেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। যার ফলে সংক্রমণের হার কিছুটা স্বাভাবিক হয়।তিন সপ্তাহ পর কলেজ খুললে দুই দিনের মাথায় আবারও সবকিছু ত্রিশ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে সরকার।যে দেশ গুলো ঘনবসতিপূর্ণ সে দেশে অনেক মানুষ আক্রান্ত হয় এবং অনেক মানুষ মারাও যায় এই ভাইরাসের কারণে।কয়েক মাস পর কয়েকটা দেশ মিলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধের জন্য কিছু  প্রতিরোধ মূলক টিকা আবিষ্কার করে টিকা গুলো হলো মর্ডানা,সিনোফার্ম ইত্যাদি। এগুলো যখন মানুষকে দেওয়া শুরু হলো, তার কিছু দিনের মাথায় কয়েক টি দেশ আরও ভেকসিন আবিষ্কার করে। এগুলো প্রতিটি দেশের মানুষকে দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করল প্রতিটি দেশের সরকার। এগুলো ভেকসিন দেওয়ার পরও অনেকের শরীরের আবারও ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল।মানুষ আতঙ্কের কারণে এক জেলা থেকে অন্য জেলা কিংবা আত্মীয়দের বাসায় পর্যন্ত যেত না।এইভাবে গৃহবন্দী জীবন চলে গেল তিন মাস।

এবার কলেজের ক্লাস শুরু হলো।প্রথম ক্লাসের দিনই আমরা তিন বন্ধু ক্লাসে উপস্থিত হলাম। হঠাৎ ক্লাসে ভাইস প্রিন্সিপাল উপস্থিত হলেন।উপস্থিত হয়ে সবার দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে কে কি অবস্থায় ক্লাসে উপস্থিত হয়েছে। আমরা তিন বন্ধু একই বেঞ্চে বসে আছি হঠাৎ আমার দিকে চলে আসেন ভাইস প্রিন্সিপাল এবং আমাদের সাথে চড়া গলায় বলে উঠলেন তোমাদের মুখে মাস্ক কই, মাস্ক ছাড়া ক্লাস রুমে প্রবেশ করা নিষেধ। আমরা ক্ষমা চেয়েনিলাম কিন্তু তিনি আমাদেরকে বুঝলেন না বা বোঝার চেষ্টাও করলেন না। কলেজ লাইফের প্রথম ক্লাস থেকে আমাদের বের করে দেওয়া হলো। বার বার ক্ষমা চাওয়া সত্বেও। আমি ওদের দুই জনকে বললাম প্রথম ক্লাস টা করেই যাই যেহেতু অনেক দূর থেকে এসেছি তো দোকান থেকে পনের  টাকা দিয়ে মাস্ক কিনে নিয়ে আসি। কিন্তু মনের অবস্থা ভালো নেই কারো তাই কলেজের মাঠের মধ্যে গাছের তলায় গিয়ে বসলাম। আমার বন্ধুরা বলল একবার সবার সামনে অপমান করে বের করে দিল সেখানে দ্বিতীয় বার কেমন করে যাই ক্লাস করতে। তাই তিন জনে সিদ্ধান্ত নিলাম এই কলেজে আর আসবো না এবং কোন ক্লাস ও করবো না। উপস্থিতির বিষয় নিয়ে শিক্ষকেরা কি সিদ্ধান্ত নেয় নিক কিন্তু আমরা আর কোন ক্লাসই করবা না। কেন আমাদেরকে ক্ষমা চাওয়া সত্বেও কলেজ থেকে সবার সামনে বের করে দেওয়া হলো।তিনি ইচ্ছা করলেই কি ক্ষমা করতে পারতেন না? কিন্তু কেন তা করলেন না তা আমরাই জানি। এই বিষয় নিয়ে বেশি না ভেবে তিন জনে যার যার বাড়ি সে চলেগেলাম।

এর পর থেকে মাঝে মধ্যে কলেজ খোলা থাকে মাঝে মধ্যে কলেজ বন্ধ থাকে করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার জন্য। গৃহবন্দী এই জীবনে বাসায় বসে একটু একটু করে কলেজের একাডেমিক পড়াশোনা তিনজনই পরামর্শ করে পড়তে থাকি। করোনা ভাইরাস একটু স্বাভাবিক হলেই আমরা ইংরেজি প্রাইভেট পড়া শুরু করি। নিয়মিত যাতায়াত করতাম, কোনো কারণ ছাড়া প্রাইভেট মিস দিতাম না। কিন্তু আমার একটা অভ্যাস ছিল প্রাইভেটে দেরিতে পৌঁছানো।এটার পিছনে অন্য রহস্য লুকিয়ে আছে তা সবাই জানে না এমনকি আমার বন্ধুরাও না। কেনই বা আমি তাদের এই সম্পর্কে বলি নাই বা জানাই নাই তা হয়তো আমিই জানি।আজ তোমরা তা জানবে। আমি অষ্টম শ্রেণিতে উঠার পর থেকে টিউশন করাইতাম। কিন্তু কেন করাইতাম?তা হয়তো আমিই জানি। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট অর্থ ছিল কিন্তু কেন এই প্রাইভেট পড়ানো? তাও হয়তো আমি জানি, আজ তেমরাও তা জানবে। আমার বাবা আমাকে অষ্টম শ্রেণিতে উঠার পর বলেছে নিজে রোজকার করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে শেখো।আমি আর কোন অর্থ তোমার পিছনে ব্যায় করব না। পরিশ্রমী হও অর্থ দিব না দোয়া রইলো তোমার প্রতি। নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে মানুষের মতো মানুষ হও।এর বেশি তোমার কাছে আর আমার চাওয়া পাওয়া নেই।আমার বাবা পড়তে পারে নি কিন্তু তিনি তার ভাইকে তার সম্মানের আসনে পৌঁছাতে যথেষ্ট হেল্প করেছেন। আমার বাবা কঠোর পরিশ্রম করে তার ছোট ভাইকে পড়াশোনা করিয়েছেন।কিন্তু কেন তিনি নিজের ছেলের বেলায় এই সিদ্ধান্ত নিলেন তা হয়তো আমিও জানি না আমাকে জানায়ও নাই। আমার চাচা বায়োলজির লেকচারার। তিনি কখনোই পড়াশোনার বিষয়ে আমার কাছ থেকে জানতে চাননি। কিন্তু কেনই বা  জানতে চান নাই?  তা আমিই জানি। কথাটা না হয় নাই বললাম। আমি এবার কি করবো উপায় বা কি। ছোট মাথায় এত চিন্তা রাখি কেমনে। শিক্ষককে এই বিষয় খুলে বললে তিনি টিউশন এর ব্যাবস্থা করেন। এর পর থেকে শুরু হলো সংগ্রাম। তখন থেকে দুই, তিন জন, করে টিউশন করে কলেজে উঠা।এই জন্য আমার প্রাইভেট যাইতে দেরি হইতো।কেননা আমি নিজে টিউশনি করার পর স্যারের কাছে যাইতাম। প্রতিদিন দশ-পনেরো মিনিট দেরি হইতো। সময় মেইনটেইন করতে না পারর কারণে।

এদিকে কলেজের আইসিটি বই খুলে দেখি তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম অধ্যায় কিছুই বুঝি না। আমার বন্ধু শিমুল কে বললাম আইসিটি বই কি করা যায়। তখন সে বলল আমাদের এলাকায় সুন্দর,দক্ষ  একজন আইসিটি শিক্ষক আছে আমরা তাঁর কাছে গিয়ে পড়তে পারি। অবশেষে তাঁর কাছে একদিন আমরা তিন বন্ধুই গেলাম
এবং কথা বলে আসলাম। তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়ে আমাদের মনুষ্যত্ব, মানবিকতা,চারিত্রিক গুণাবলি গুলো জাগ্রত হয়েছে। তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়ার আগে আমারা অন্ধকারে ছিলাম।শ্রদ্ধেয় ফিরোজ স্যার ম্যাথ এ  অনার্স, মাস্টার্স করার পরেও তিনি সব বিষয়েই দক্ষ ছিলেন।তাঁর কাছে পড়তে না গেলে হয়তো আমারা অনেক পিছিয়ে থাকতাম। বার জন মেয়ে এবং পাঁচ জন ছেলে সহ আমরা প্রথমে তার কাছে প্রাইভেট শুরু করলাম।এক মাস পড়ার পর মেয়েগুলোকে আমরা আলাদা করে দিই।মেয়েদের সাথে পড়তে ভালো লাগে না ছোট বেলা থেকেই শুধু ছেলেদের ব্যাচেই পড়তাম কখনো মেয়েদের ব্যাচে পড়ি নাই কিন্তু এখানে এক মাস পড়ছি বাধ্য হয়ে কেননা ব্যাচ টা শুরু করেছিল মেয়েগুলো। মেয়েগুলোর মাঝে কিছু ভুল এবং অযুহাত ছিল যার কারণে আমরা ব্যাচ আলাদা করি। পরবর্তী মাস গুলোতে আমরা চার-পাঁচ জনই আসতাম এবং যা পারি না তা বুঝে নিয়ে বাসায় যাইতাম। ক্লাস শেষে স্যার সুন্দর সুন্দর গল্প বলতো। স্যার যে অবস্থাতে থাকুক না কেন তাঁর মুখে সবসময়ই হাসি থাকে। তিঁনি স্বভাবিক কথা এমন ভাবে বলতেন যা যেকোনো মানুষ শোনামাত্র হেসে উঠবে। স্যারের যে এত সুন্দর একটা মন আছে তা তাঁর কাছে না গেলে হয়তো জানতামই না। যতদিন তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়েছি তত দিন তিনি উৎসাহিত করেছেন আমরা যাতে ভালো করে পড়াশোনা করে পিতা-মাতা, শিক্ষকদের সম্মান রক্ষা  করতে পারি। তিঁনি আমাদের সাথে বন্ধুত্বের ন্যায় মেলামেশা করতেন এবং আমাদের যেকোনো সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করতেন।এমনকি আমাদের পড়াশোনার গতি ঠিক রাখার জন্য আইসিটি বইয়ের পাশাপাশি অন্য বিষয় গুলোর অধ্যায় ভিত্তিক পরিক্ষা নেন। যা হয়তো অন্য কেউ করতো না। আমার দেখা সবথেকে  সুন্দর এবং সুন্দর মনের মানুষদের মধ্যে তিঁনি একজন।

এদিকে একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা খুব কাছাকাছি চলে আসল। তিন জনেই এই মূহুর্তে কি করা যায় বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে তা ভাবছি।কিছু দিন যাওয়ার পর হঠাৎ আমাদের এক সহপাঠী বলল যে কলেজের আশেপাশে সাদেক সাদাত নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক বড় ভাই তিনি বাংলা পড়ান। এই কথা শোনার পর আমরা তার সাথে দেখা করতে গেলাম।দেখা করা শেষে তিনি আমাদের অনেক উপদেশ দেন। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর কাছে বাংলা প্রাইভেট পড়া শুরু করলাম এবং এক মাসের মধ্যে শেষ করাই দেন। দ্রুত শেষ করার কারণ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ক্লাস করতে যাবেন। আমাদের কলেজের কবিতাগুলো অনেক সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দেন যার ফলে আমাদের মনোবল আরও দৃঢ় হয়। এই বাংলা প্রাইভেট পড়ার পর কলেজ জীবনে আসলে কি পরিমাণ পড়াশোনা করা  প্রয়োজন তা বুঝতে পেরেছি কেননা এই সময়ে শ্রদ্ধেয়  সাদেক ভাই ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে তাঁর  অনেক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।এইভাবে একবছর যাওয়ার পর একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা শুরু হলো। প্রথম যেদিন পরীক্ষা দিতে গেলাম সাথে বোর্ড নিয়ে গেছি যাতে লেখা গুলো একটু ভালো করে লিখতে পারি। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলো। প্রথম পরীক্ষা বাংলা ফাস্ট পেপার। এমসিকিউ গুলো অনেক কঠিন হয়েছে সিকিউ গুলো স্বাভাবিক হয়েছে। এমসিকিউ দাগানোর মাঝে হঠাৎ ভাইস প্রিন্সিপাল রুমে প্রবেশ করে এবং তিন- চার জনের বোর্ড হাতে নিয়ে মাঠে ছুড়ে মারলেন পুরাতন বোর্ড হওয়ার জন্য। এই তিন-চার জনের মধ্যে আমার বন্ধুর ও একটা বোর্ড ছিল। বোর্ড ছুড়ে ফেলে দেওয়ার পর তিনি বললেন একটা বোর্ড কত টাকা তাকেই কিনতে পারো না তাহলে পড়তে আসছ কেন? মনের অবস্থা ভালো নেই বন্ধুর একদিকে এমসিকিউ দাগানোর সময় চলে যাচ্ছে অন্য দিকে করা কথা শোনাচ্ছে শিক্ষক। বন্ধু কিছু বলতে চেয়েছিল সবার সামনে খারাপ আচরণ করার জন্য  বাট বলতে পারে নাই কিন্তু কেন? তাও আমিই জানি।

পিছনে আমার ক্লাস সহপাঠী পরিচিত একজন ছিল সে অন্য জনের স্কেল নিয়ে খাতায় মার্জিন টেনেছে এই দৃশ্য ভাইস প্রিন্সিপালের চোখে পড়লে ঐ সহপাঠীকেও সবার সামনে খারাপ আচরণ করেন তিনি। আমার বিপরীত পাশে আর একজন সহপাঠী ছিল সে সামন্য একটু অন্যের থেকে হেল্প নিয়েছে। এটা দেখার পর তার খাতা পুরো টাই ছিড়ে ফেলে এবং ছুড়ে মারে মাঠের মাঝখানে। ধারণাই ছিল না যে প্রথম পরীক্ষা টা এভাবেই দিতে হবে। এবার দুই দিন বন্ধের পর দ্বিতীয় পরীক্ষা শুরু হলো পরীক্ষার মাঝে আবারও হঠাৎ উপস্থিত হয় ভাইস প্রিন্সিপাল কয়েকজন সহপাঠীর হাতে ফোন পেলে তা নিয়ে অফিস কক্ষে চলে যান।এদিকে আমরা পরীক্ষা দিচ্ছি। কিন্তু শিক্ষকের আচরণ দেখে কেউই সন্তুষ্ট নয়।কলেজে এমনই সুনাম ছিল ঐ ভাইস প্রিন্সিপালের। আমরা ইতিহাস ঘাঁটলে তা ভালো ভাবেই দেখতে পাই।এই ভাবে একাদশ শ্রেণি শেষ হয়ে যায়। পরীক্ষা গুলো ছাড়া অন্য কোন দিন আমরা ক্লাস করতে যেতাম না কারণ আমাদের প্রথম দিনই ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

এবার আগে যে শ্রদ্ধেয় কামরুল স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তাম তিনি ইংরেজি প্রথম পত্র অনেক সুন্দর নিয়মে পড়াতেন কিন্তু হঠাৎ কোন কারণে তা বাদ দিয়ে আমাদের কলেজের শিক্ষক অর্থ্যাৎ সেই বিখ্যাত, শ্রদ্ধেয় সাহজাহান স্যার এর কাছে পড়তে আসি। সাহজাহান স্যার সপ্তাহের শেষে অর্থাৎ প্রতি  বৃহস্পতিবার করে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কিছু শেখাতেন। তখন থেকে আমাদের আশার আলো জেগে উঠে। ইনি কেন বিখ্যাত? তার অনেক কারণ আছে প্রথমত সপ্তাহে ছয়দিন পড়ান,মাসিক সামান্যই নেন সবার কাছ থেকে, আগাম ভর্তি পরীক্ষার জন্য উৎসাহিত করেন ছাত্রদের,এবং বন্ধুত্বের মতো আচরণ করেন।ক্লাসে মাঝেমধ্যে সবাইকে সামান্য কথার মাধ্যমে হাসাতেন  শুধু এই জন্যই নয় তিনি সৎ ও ন্যায়ের পক্ষে ছিলেন সর্বদা।আমাদের উপজেলার মধ্যে ইংরেজি সনামধন্য শিক্ষক তিনি।ইংরেজি প্রথম পত্র বোর্ড বই টা পুরো মুখস্থ তাঁর। আমাদের যখন ক্লাস নিতেন তখন তিনি বই ছাড়া লেকচার দিয়েছিলেন এই জন্য তিনি বিখ্যাত।

আমরা তিন বন্ধু বুদ্ধি করে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কিছু বই কিনি এবং পড়তে শুরু করি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার উঠার আগেই। তিন বন্ধু যুক্তি করে পড়তাম। কে কি বিষয় পড়তাম তা সবাই সবাইকে বলতাম। এই ভাবে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি তিন বন্ধু।একদিকে মহামারির তাণ্ডব শুরু হয়েছে অন্য দিকে পড়াশোনা ঠিক ঠাক চালিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে কেননা প্রাইভেট বন্ধ হয় এই সময় টাতে। কখনো ভাইরাসের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায় আবার কখনো কমে এই ভাবে চলে যায় দিন, চলে যায় মাস। কিছু দিন পর করোনা ভ্যাকসিন নেই একসাথে। দুই মাস পর আবারও আর একটা ডোজ নেই।এবার অন্যান্য কলেজে  মডেল টেস্ট পরিক্ষা হলেও আমাদের কলেজে মডেল টেস্ট পরীক্ষা হলো না। দুই মাস পর এইসএসসি পরিক্ষা শুরু হলো। মোটামুটি সব কয়টা পরীক্ষা ভালোভাবেই শেষ হলো। পরীক্ষা যেদিন শেষ হয় সে দিন ফোকাসের প্লেকার্ড বিতরণের সময় আমরাও একটা নিলাম।আগে থেকেই তিন বন্ধুর প্ল্যান ছিল পরীক্ষা শেষে রংপুর গিয়ে রংপুর ফোকাস শাখায় ভর্তি হব।এবার তাই করলাম। প্লেকার্ডে দেওয়া নাম্বার অনুযায়ী ফোকাস শাখায় গিয়ে ভর্তি হই। আমরা ফোকাসে যার কাছে গিয়ে ফর্ম নিয়ে পূরণ করলাম তিনি যে পরিচালক রংপুর শাখার তা আমরা জানতাম না পরবর্তীতে তা জানতে পারি। আমরা যেহেতু তিন জনের কেউই ম্যাচ সম্পর্কে জানি না তাই সাদেক ভাইয়ের থেকে যেনে নেই যে রংপুর শহরের ফোকাস শাখার আশেপাশে কোন কোন জায়গায় ম্যাচ আছে। এর পর রংপুর লাল বাগে গিয়ে ম্যাচ খুজি পড়াশোনা করার জন্য। সারাদিন ম্যাচ খুঁজেছি মনের মতো পাই নাই এবার সন্ধায় একটা ম্যাচ পেলাম সেখানে গিয়ে উঠলাম। এই ম্যাচে যেদিন প্রথম সকালে খবার খাব তখন খাবারের পরিমাণ দেখে চোখে পানি আসল কেননা খাবারের পরিমাণ এতই কম ছিল তা কল্পনার বাইরে।একমুঠো ভাত খেয়ে পড়াশোনা করবো কেমনে। তার পর দুপুরে ও রাতের  ভাত খাওয়ার সময় দেখলাম এক পেলেটের থেকে একটু বেশি অর্থ্যাৎ এই খাবার তাও চলনসই।আমরা গ্রামে সকালে বেশি পরিমাণ খাবার খাইতাম কিন্তু দুপুরে হালকা খাবার খাইতাম কোন কোন দিন দুপুরে খাবার খাইতামই না।শহর এবং গ্রামের পরিবেশ সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা যেহেতু গ্রামে ছোট থেকে বড় হয়েছি তাই গ্রামের পরিবেশ শরীরের সাথে খাপখাইয়ে গিয়েছিল।কিন্তু শহরে এসে নিজেকে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে অনেক সময় লাগে। যার কারণে অল্প কয়েক দিনে শরীরের বাজে অবস্থা হয়েছে। ম্যাচে কয়েক দিন থাকার পরে হঠাৎ একদিন সিনিয়রেরা ডেকে একটু ম্যানার শেখায় যা পরবর্তীতে কাজে দিয়েছে। ম্যাচে অনেক ধরনের ভাইয়ের হেল্প পেয়েছি তারা আমাদের আগ্রহ দেখে পড়াশোনা করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন।

 একমাস পর যখন বাসায় বেড়াতে যাই তখন আমাকে দেখে আমার মা কেঁদে ফেলল শরীরের একমাসে বেহাল অবস্থা দেখে। বাসায় যখন গেলাম তখন বাসায় খাবার দিল কিন্তু খাইতে পারলাম না আগে যেমন খেয়েছিলাম সেই রকম। কেননা এখন কম খাইতে খাইতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাসা থেকে কিছু চাল,চিরা,বিস্কিট নিয়ে রংপুরের উদ্দেশ্য রওনা দিই যাতে খাবারের অসুবিধা না হয়। মাঝে মধ্যে শিমুল এর বাবা বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসতো সেই সাথে আমার পরিবার থেকেও খাবার পাঠায় দিত। ম্যাচের খাবার এতো বাজে ছিল তাই ভালো ভাবে খাইতে পারতাম না। তাই মাঝে মধ্যে হোটেলে ও পাক করে খেতে হয়েছে। এমনও দিন গেছে যখন মেসের বুয়া আসে নাই তখন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। কেননা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই সামান্য পরিশ্রম টা তখন গায়ে লাগে নি।  কোচিং এর ক্লাস গুলো এবং পরীক্ষা গুলো নিয়মিত দিতাম। আমাদের সেশনে রংপুর ফোকাস শাখার পরিচালক রোকুনুজ্জামান রবি ভাই আমাদের ভালো ভাবে দেখা শোনা করতেন। কি পড়তেছি কি করতেছি তা দেখার জন্য ম্যাচের রুমে পর্যন্ত এসেছিলেন তিনি। আমরা তিনজনই একই ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলাম যাতে কোচিং যাওয়া আসা করতে সুবিধা হয়। প্রতি দিন একসাথে যেতাম আসতাম।কে কোন টপিক পড়লাম, তা একে অন্য কে ধরতাম। এই ভাবে ভর্তি নামক যুদ্ধের সমাপ্তিতে পৌঁছাই। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে ভর্তি পরীক্ষা গুলো ভালো ভাবে শেষ করি। অনেক  জায়গায় চান্স পেলেও নিজের সুবিধা মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। মফিদুল ঢাবিতে  ইকোনমিকস বিভাগে, শিমুল ঢাবিতে সাংবাদিকতা বিভাগে এবং আমি চবিতে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই।ভর্তি নামক যুদ্ধে হাজারও সৈনিকের সাথে দেখা হয় পরিচয় হয়, লড়াই হয়। এখানে কে কিভাবে পড়ে বা পড়াশোনা করে তা কাউকেই জানাতে চায় না। কেননা এটা যুদ্ধ এখানে নিজের জীবন নিয়েই টানা টানি। পাঁচ -ছয় মাসের ভর্তি নামক যুদ্ধের সমাপ্তি এইভাবেই ঘটে।

মোঃ নাহিদ মিয়া
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial