ঢাকামঙ্গলবার , ৫ ডিসেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

যেসব হাদিস; হাদিস নয়

মৃধা প্রকাশনী
ডিসেম্বর ৫, ২০২৩ ৯:১৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইসলামি শাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হাদিস। মর্যাদার দিক থেকে কুরআনের পরেই হাদিসের অবস্থান। পরিভাষায় হাদিস বলতে, রাসূল (সঃ) যেসব কাজ করেছেন ও আমাদেরকে করতে নির্দেশ প্রদান করেছেন কিংবা সাহাবিদের কোনো কাজকে তিনি উপস্থিত কিংবা বা অনুপস্থিত অবস্থায় সমর্থন করেছেন সেসব কাজকে বুঝায়। কুরআনের আলোকে ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হাদিসশাস্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, আল্লাহপ্রদত্ত অহী অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের বোধগম্য নয়। হাদিসে রাসূল (সঃ) এমন দুর্বোধ্য বিষয়সমূহের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।

রাসূল (সঃ) এর ইন্তেকালের পরে তার সাহাবিগণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এসব হাদিস হুবহু শব্দে-অর্থে মানুষের নিকট বর্ণনা করতেন এবং খণ্ডখণ্ডভাবে নিজেদের কাছে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করতেন। রাসুল (সঃ) এর মুখনিঃসৃত বাণীতে অনিচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় তারা হাদিস বর্ণনায় অত্যাধিক কার্পণ্য করতেন! এমনকি সামান্যতম বিস্মৃতির আশঙ্কা থাকলে তারা হাদিস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং রাসূল (সঃ) সতর্ক করে বলেন, “খবরদার! তোমরা আমার নামে বেশি হাদিস বলা থেকে বিরত থাকবে। যে আমার নামে কিছু বলবে, সে যেন সঠিক কথা বলে। যে আমার নামে এমন কথা বলবে যা আমি বলিনি তাকে জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।” (সুনানু ইবনি মাজাহ ১/২৯)

রাসূলের (সঃ) ওফাত পরবর্তী যুগে মুসলিম খলিফাগণের যোগ্য নেতৃত্বে ইসলাম ধীরেধীরে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পরতে থাকে। পাশাপাশি আরব বণিকেরা ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে গমন করতঃ ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। ওলি-আউলিয়া, দরবেশ, বুযুর্গগণ নবাগত মুসলিমদের নিকট ইসলামের হুকুম-আহকাম বর্ণনা করতে থাকেন। কুরআনের বিধানাবলী বর্ণনায় তারা হাদিসের সহযোগিতা গ্রহণ করেন। এতে ব্যপকভাবে হাদিস বর্ণনার প্রবণতা দেখা দেয়। ফলে রাসূলের (সঃ) মুখনিঃসৃত পবিত্র বাণীর সঙ্গে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুল-ভ্রান্তি প্রবেশ করতে থাকে।

এ প্রসঙ্গে ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান (মৃত্যু : ১৯৮ হি.) বলেন, “নেককার বুযুর্গরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাদিসের বিষয়ে যত বেশি মিথ্যা বলেন অন্য কোনো বিষয়ে তারা এমন মিথ্যা বলেন না।” ইমাম মুসলিম (মৃত্যু : ২৬১ হি.) এ কথার ব্যাখ্যায় বলেন, এ সকল নেককার মানুষেরা ইচ্ছা করে মিথ্যা বলেন না, কিন্তু বেখেয়ালে তারা মিথ্যাচারে লিপ্ত হন। কারণ তারা হাদিস সঠিকভাবে মুখস্ত রাখতে পারেন না, উল্টে পাল্টে ফেলেন। অধিকাংশ সময় মনের আন্দাজে হাদিস বলেন, ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাচারে লিপ্ত হন।” (সহীহ মুসলিম ১/১৭-১৮)

বুখারী, মুসলিম, মুয়াত্তা গ্রন্থপ্রণেতা ব্যতিত অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ হাদিস সংকলনে সহিহ, জয়ীফ ও জাল হাদিসের বাচবিচার করেননি। বরং সমাজে রাসূলের (সঃ) নামে প্রচলিত সকল কথাকে তারা একত্রিত করেছেন। ফলে তাদের গ্রন্থসমূহে সহীহ হাদিসের পাশাপাশি জাল ও বানোয়াট হাদিসও স্থান পেয়েছে এবং মুফাসসিরগণও কোনোরূপ তাহক্বীক ব্যতিত বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যায় এসব গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। ফলে তাদের অজান্তেই বেশ কিছু জাল হাদিস তাফসিরের গ্রন্থগুলোতে প্রবেশ করে। অপরদিকে মুসলিম ছদ্মবেশধারী মুনাফিকেরা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে কিংবা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার মানসে প্রচলিত সনদ উল্লেখপূর্বক নিজেদের কথাকে হাদিস নামে প্রচার করতে থাকে।

আল্লামা যাইনউদ্দিন ইরাকী (মৃত্যু : ৮০৬ হি.) বলেন, হাদিস জালকারীগণ তাদের জালিয়াতির উদ্দেশ্য ও কারণের দিক থেকে বিভিন্ন প্রকারের। যথা :

১. অনেক যিনদীক মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য হাদিস বানিয়েছে।

২. অনেকে নিজের ধর্মীয় মতের সমর্থনে হাদিস জাল করেছে।

৩. কিছু মানুষ খলিফা ও আমিরদের পছন্দসই বিষয়ে হাদিস জাল করে তাদের প্রিয়ভাজন হতে চেষ্টা করেছে।

৪. কিছু মানুষ ওয়ায ও গল্প বলে অর্থ কামাই করার মানসে হাদিস জাল করেছে।

৫. কেউ কেউ নিজেদের ফাতওয়া বা মাসআলার দলিল প্রতিষ্ঠার জন্য হাদিস বানাতেন।

৬. কিছু মানুষ এভাবে মিথ্যা হাদিস তৈরি করাকে দ্বীনদারী মনে করতেন। তারা তাদের বিভ্রান্তির কারণে মনে করতেন যে, মানুষদের ভালোর পথে ডাকার জন্য মিথ্যা বলা যায়! হাদিস জালিয়াতিতে এরাই ছিলেন সবচেয়ে ভয়ংকর ও ক্ষতিকারক। তারা যেসকল বিষয়ে হাদিস বানিয়েছেন, তার অনেক বিষয়ে অনেক সহিহ হাদিস রয়েছে। কিন্তু এ সকল নেককার মানুষ অনুভব করেছেন যে, এ সকল সহিহ হাদিসের ভাষা ও সেগুলিতে বর্ণিত পুরস্কার বা শাস্তিতে মানুষের আবেগ আসে না। তাই তারা আরো জোরালো ভাষায়, বিস্তারিত কথায়, অগণিত পুরস্কার ও কঠিনতম শাস্তির কথা বলে হাদিস বানিয়েছেন, যেন মানুষেরা তা শুনেই প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

তারা যে কথাকে ইসলামের পক্ষে বলে মনে করেছে তা সর্বদা ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। আজগুবি গল্প, অল্প কাজের অকল্পনীয় সাওয়াব, সামান্য অন্যায়ের বা পাপের ঘোরতর শাস্তি, সৃষ্টির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাল্পনিক কাহিনী, কাল্পনিক অলৌকিক কাহিনী, বিভিন্ন বানোয়াট ফজিলতের কাহিনী ইত্যাদি মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে বিচ্যুত করেছে। নফল ‘ইবাদতের’ সওয়াবে বানানো মনগড়া সওয়াবের কল্প কাহিনী মুসলিম উম্মাহকে ফরজ দায়িত্ব ভুলিয়ে দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর পবিত্র আঙিনাকে মিথ্যার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রাখতে এবং জাল হাদিস চিহ্নিতকরণে মুসলিম গবেষকগণ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। সাহাবীদের থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইলমে দ্বীনের ‘নাকিদ’ মুহাদ্দিসগণ তুলনামূলক সনদ-মতন নিরীক্ষার মাধ্যমে কুচক্রী-ইসলামবিদ্বেষীদের মিথ্যা ও বানোয়াট কল্প কাহিনী থেকে সহিহ হাদিসসমূহকে পৃথক করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। মুহাদ্দিসগণের এতধিক সতর্কতার পরেও একদল আলেমের গবেষণাবিহীন আলোচনা এবং হাদিসের মিথ্যাচারের ব্যাপারে অসতর্কতার কারণে বিভিন্ন জাল ও বানোয়াট হাদিস মানুষের মাঝে প্রচলিত আছে। সাধারণ মুসলমানদের জ্ঞাতার্থে সমাজে হাদিস নামে প্রসিদ্ধ অথচ প্রকৃতপক্ষে হাদিস নয় এমন কিছু কথা “প্রচলিত জাল হাদিস”, “প্রচলিত জাল হাদিস: একটি তাত্ত্বিক আলোচনা” ও “হাদিসের নামে জালিয়াতি” এই তিনটি গ্রন্থ থেকে নিন্মে উপস্থাপন করা হলো :

১. (হে মুহাম্মদ) আপনি না হলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতাম না।

২. যে নিজেকে চিনল সে তার রবকে চিনল।

৩. যার পীর নেই, তার পীর শয়তান।

৪. আলিম বা তালিব ইলম যখন কোনো গ্রাম-মহল্লা দিয়ে গমন করেন তখন আল্লাহ সে গ্রাম বা মহল্লার গোরস্থানের আযাব ৪০ দিনের জন্য তুলে নেন।

৫. মৃত ব্যক্তি সাত দিন পর্যন্ত তার বাড়ির মানুষদেরকে দেখতে পায়।

৬. আল্লাহ আশুরার দিনে আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন।

৭. খাদ্য গ্রহণের সময় কথা না বলা।

৮. খাওয়ার সময় সালাম না দেওয়া।

৯. মাদরাসা নবীর ঘর।

১০. জ্ঞানীদের কালি শহীদদের রক্ত থেকে অধিক মর্যাদাবান।

১১. বেলাল (রাঃ) এর একটি কাহিনী… রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ইন্তেকালের পর তিনি মদিনা থেকে চলে যান। পুনরায় রাসুলুল্লাহকে স্বপ্নে দেখে মদিনায় আগমন করেন।… আযান দেন…ইত্যাদি।

১২. পাগড়ীসহ দু’রাকাআতে ৭০ রাকাআতের সওয়াব।

১৩. দরিদ্র মুসলিমগণ ধনীদের চল্লিশ বছর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবেন।

১৪. ইমামতিতে ধাক্কা-ধাক্কি কেয়ামতের আলামত।

১৫. জুমুআর সালাত দরিদ্রদের হজ্জ।

১৬. রাসূল (সঃ) সর্বদা হাযির-নাযির।

১৭. রাসূল (সঃ) মিলাদের মাহফিলে উপস্থিত হন।

১৮. ওলী-আউলিয়াদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত সবই হারাম!

১৯. মূর্খের ইবাদতের চেয়ে আলিমের ঘুম উত্তম।

২০. চীনদেশে গিয়ে হলেও জ্ঞান সন্ধান করো।

২১. দেশপ্রেম ঈমানের অংশ।

২২. আযানের সময় বৃদ্ধাঙ্গুলি চোখে বুলানো।

২৩. সালাত মুমিনদের মি’রাজ।

২৪. মৃত্যুর পরে লাশের নিকট কুরআন তেলাওয়াত করা।

২৫. অসুস্থ ও মৃত ব্যক্তির জন্য বিভিন্ন প্রকারের খতম।

২৬. স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত।

২৭. শুকর বা শুয়র বললে ৪০ দিন মুখ নাপাক থাকে।

এছাড়াও সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা নিন্মে উল্লেখ করা হলো :

২৮. যদি কারো কথা বলার সময় অথবা কোনো কাজ করার সময় টিকটিকি শব্দ করে তাহলে সাধারণ মানুষেরা বলে, টিকটিকি এ কাজ বা কথাটি ঠিক বলে জানাচ্ছে। তারা বোঝাতে চান যে, এ কাজটি বা কথাটি সম্পূর্ণ সত্য ও সঠিক, তাই টিকটিকি এর সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। (এ বিশ্বাস পোষণকারী কঠিন গুনাহগার হবেন)

২৯. মহিলারা ধারণা করে যে সৃষ্টিগতভাবে জোড়া ফল ভক্ষণ করলে জোড়া বা জমজ সন্তান হয়। (এটা বিলকুল ভ্রান্ত কথা)

৩০. খাদ্য বা পানীয় শ্বাসনালীতে, তালুতে বা নাকের মধ্যে চলে গেলে সাধারন মানুষেরা বলে যে, কেউ তাকে স্মরণ করেছে। (এটা একেবারে ভুল কথা)

৩১. কারো নাম নেওয়ার সময় সে যদি উপস্থিত হয়ে যায় তবে সাধারণ লোক বলে তোমার হায়াত বৃদ্ধি পাবে। (এটা বিলকুল মিথ্যা ও বাতিল কথা)

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এসব মিথ্যা ও বানোয়াট বিষয়াবলি পরিত্যাগ করে কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত পদ্ধতিতে ইবাদতের মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জনের তৌফিক দান করুক। আমিন।

লেখক: নাইম হোসেন তামিম

আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial