ঢাকাশনিবার , ২ ডিসেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

বিধ্বস্ত বিজয়োল্লাস

মৃধা প্রকাশনী
ডিসেম্বর ২, ২০২৩ ১০:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

“পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বাংলার আপামর জনতা। গাঁয়ের অসূর্যম্পশ্যা তনয়া কুমারিত্ব রক্ষার্থে, সধ্ববা স্ত্রীলোক তার সন্তানকে আগলে রাখতে প্রতিহত করছে আঘাতের পর আঘাত। বাংলার অদক্ষ-নিরস্ত্র, কৃষক-জেলে সশস্ত্র বাহিনীর মোকাবিলায় আমৃত্যু লড়াই করে যাচ্ছে। বাঙালীর বুদ্ধিদীপ্ত-অপ্রতিরোধ্য কৌশলে পিছু হটতে শুরু করেছে বর্বর হানাদার বাহিনী। ইতঃমধ্যে দেশের কিছু অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়েছে। বাংলার স্বাধীনতা আর বেশি দূরে নয়। আমরা বাঁচবো, নতুন করে বাঁচবো, উন্মুক্ত আকাশের নিচে নির্ভয়ে বাঁচতে পারবো আমরা।”

ভাঙাচোরা একটি টঙের দোকানে বসে এমন বার্তা শুনছিল আর পাকবাহিনীর উপর অবিশ্রান্ত ভর্ৎসনা করছিল তিন-চারজন লোক। স্থূলদৃষ্টিতে লোকগুলোকে মুক্তিবাহিনী সংশয় না হলেও এদেশের মুক্তির জন্য এরা প্রৌঢ়ত্বের সেবা-শুশ্রূষা কিংবা নববধূর প্রণয়পূর্ণ সোহাগ উপেক্ষা করতে প্রস্তুত আছে — এমনটা তাদের পরস্পর বাক্যালাপে স্পষ্ট। টঙের ঠিক দশ-বারো গজ দূরে দাঁড়িয়ে এমনটাই ভাবছিলো ‘বিজয়’। বিজয় গাঁয়েরই ছেলে, তবে আপন গৃহের আঙিনাটুকু রেখে বাকি পৃথিবীটা তার কাছে চিরদিনই অপরিচিত। কৈশোর পার করেনি এখনো, তাই এমন স্বল্পবয়সী, সংযতবাক, আত্মভোলা ছেলেটিকে বিস্তৃত অনধীত অবনিতে কখনো দৃষ্টির আড়াল করেননি তার বাবা-মা।

দেশের এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে যুদ্ধ-বিগ্রহের আশঙ্কায় পিতৃব্যের কাছে নিরাপদে রেখে এসেছিলেন বিজয়কে। মাসখানেক পরপর দুই-একখানা চিঠির মাধ্যমে দুইপক্ষের শারীরিক কুশলাদি, পারস্পরিক পরিস্থিতির খবরাখবর আদান-প্রদান হতো। কিন্তু গত দুই-তিনমাস যাবৎ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পিয়নের সাক্ষাৎ না পাওয়ায় এবং পিতৃব্যের দেয়া কুশলসংবাদ মনঃপূত না হওয়ায় কারো মতামতকে জ্ঞেয় না করেই যে পথে প্রস্থান করেছিল সেই পথ ধরেই অত্যন্ত ভয় ও শঙ্কার সাথে বিজয় একাকী গ্রামে প্রত্যাবর্তন করলো।

টঙের দোকান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পরিচিত পথ ধরে গৃহভিমুখে হাটতে শুরু করলো সে। গ্রামবাংলার পরিচিত আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, পথের দুই ধারে সুপারি, নারিকেল গাছের সারি, পার্শ্ব দিয়ে বিস্তীর্ণ তটিনীর জলের প্রবাহ। কিন্তু দীর্ঘকাল গ্রাম থেকে নির্বাসিত থাকার পরেও আজ এসব সৌন্দর্য তাকে কোনোভাবে প্রলুব্ধ করলো না। পথের সীমানা ছাড়িয়ে বাড়ির উঠান, উঠান থেকে চৌকাঠ, চৌকাঠ পেরিয়ে বাবার বিশ্রামের অমলিন গদি, মায়ের সেলাইয়ে বসার পরিচ্ছন্ন শীতলপাটি — নোংরা, মলিন অবস্থায় জনশূন্য গৃহকোণে পোকামাকড়ের আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। কেউ তার আগমনে ছুটে আসলো না, কেউ এগিয়ে এসে কাপড়ের আঁচলে ঘর্মাক্ত ললাট মুছে দিলো না কিংবা অঘটিত দুর্ঘটনার সম্ভাবনায় পুনঃপুন ধমকের সুরে বুকে আশ্রিত করলো না। সহসাই অপ্রত্যাশিত বিপদের আশঙ্কা তাড়া দিলো তাকে, মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস আটকে গেল, প্রশস্ত গৃহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে লাগলো। কোলাহলশূন্য নিস্তব্ধতায় হঠাৎ কারো পদশব্দে আঁতকে উঠলো সে। পিছনে তাকিয়ে দেখল প্রতিবেশী বৃদ্ধ মুয়াজ্জিন তার বার্ধক্যের পুরনো লাঠিখানা সম্বল করে দাঁড়িয়ে আছে।

বৃদ্ধ বিজয়কে সাথে নিয়ে তার বাড়িতে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ নীরবতার পরে অত্যন্ত উৎকণ্ঠা, অনুতাপ ও আশ্বাসের সঙ্গে অস্পষ্ট কণ্ঠে যা বর্ণনা করলেন তার সারমর্ম অনেকটা এরকম — “আজ থেকে প্রায় মাস দুই পূর্বে এক তমসাচ্ছন্ন সায়াহ্নে হানাদার বাহিনীর সশস্ত্র দুইজন সৈন্য বিজয়ের বাড়িতে হামলা করে। অন্তঃপুরের গৃহিণীদের সঙ্গে সৈন্যদের পাশবিক নির্যাতনের উপক্রম হলে পরস্পর হাতাহাতি শুরু হয় এবং একপর্যায়ে বিজয়ের জননী এবং অন্তঃসত্ত্বা সহোদরা গুলিবিদ্ধ হয়। বিজয়ের পিতা মহিউদ্দিনের চতুরতায় শত্রুপক্ষের একজন নিহত হয় ও অন্যজন আহতবস্থায় পলায়ন করে। মহি গভীর রজনীতে অন্তর্দাহ বিগত করে মৃত স্ত্রী-কন্যার দাফনকার্য সম্পন্ন করে এবং প্রত্যুষে নিহত সৈন্যের বন্দুক কাধে গৃহত্যাগ করে। এরপর থেকে অদ্যাবধি তাঁকে আর গ্রামে দেখা যায়নি।”

যোজন বৃত্তান্ত শেষে বৃদ্ধ লক্ষ্য করলেন — বিজয় নিশ্চল, নিস্তেজ অবস্থায় মৃত্তিকা আশ্রিত করে নিরন্তর অশ্রুজল ভূমিসাৎ করছে। দীঘল নিস্তব্ধতা ভেঙে অশ্রুসংবরণ করে বিজয় বললো, “আমিও যুদ্ধ করবো।” বৃদ্ধ নীরব হয়ে বসে রইলেন, প্রতুত্তরে কিছু বললেন না। মুহূর্তকাল পরে তিনি অন্দরঘরের দিকে গেলেন এবং একনলা একটি বন্দুক সাথে নিয়ে ফিরলেন। বৃদ্ধ বন্দুকখানা বিজয়ের দক্ষিণহস্তে অর্পণ করে অপরহস্ত মুষ্টিবদ্ধ করে অকম্প কণ্ঠে বললেন- “

“যাও, যুদ্ধ কর। জননীর তিলার্ধ রক্তকণিকা আর ভগিনীর মাতৃসত্তার বিসর্জনকে নিষ্ফল হতে দিও না।”

১৫ই ডিসেম্বর, দিনটি ছিল বুধবার। কনকনে শীতের আবেশে শ্বাসরুদ্ধকর চরম উৎকণ্ঠার একটি দিন। প্রত্যুষের কুজ্ঝটিকা কিংবা হরিৎ তৃণের তুষারকণা মিহিরের তীব্রতায় দ্রবীভূত হতে শুরু করেছে মাত্র। বিজয় ও তার সহযোগী সৈনিকেরা প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে রণসরঞ্জাম সমবেত করতে শুরু করেছে এমন সময় তাদের কাছে সংবাদ পৌছল যে, পার্শ্ববর্তী গাঁয়ের কিছু সংখ্যক দুর্ধর্ষ লোক জনসাধারণের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করে লুটপাট চালাচ্ছে। এমন সংবাদে পীড়িত হয়ে আক্রমণকারীদের হাত থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করতে পার্শ্ববর্তী গ্রামের দিকে রওয়ানা হলো তাঁরা।

গত দুই মাস পূর্বে বিজয় তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল। এমন স্থির, অচঞ্চল, অকপট ছেলেটিকে প্রথমে সাথে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও তার আত্মপ্রত্যয় প্রত্যক্ষ করে মুক্তিবাহিনীর একজন সৈনিক বিজয়ের পক্ষ সমর্থন করে এবং সেদিন থেকেই বিজয় তাঁদের সাথে অবস্থান করে। তবে তাঁদের এহেন ভুল ধারণা ভাঙতে খুব কম সময়ই লেগেছে। যোগদানের পর থেকে প্রতিটি মিশনেই সশরীরে অংশগ্রহণ করেছে সে। কখনো শক্তি প্রয়োগে শত্রুর আক্রমণের বিপরীতে লড়াই করেছে কিংবা কখনো বুদ্ধিবলে আকস্মিক আক্রমণের হাত থেকে সহযোদ্ধাদের রক্ষা করেছে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণে সংঘবদ্ধ বিজয়োল্লাসের নিমিত্তে ঢাকার উদ্দেশ্যে গমনের পরিকল্পনা থাকলেও শত্রুদের সঙ্গে শেষবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যে সকলে পার্শ্ববর্তী গ্রামে রওয়ানা হলো এবং বরাবরের মতো এবারও বিজয় তাদের সঙ্গ দিলো।

সেখানে গিয়ে তাঁরা গ্রামে পূর্ববস্থানরত মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে শত্রুপক্ষ কর্তৃক অবরুদ্ধ দুর্গ সম্মিলিত  আক্রমণের পরিকল্পনা করলো। সশস্ত্র মুক্তিবাহিনী দুর্গের চতুর্দিক দিয়ে ঘেরাও করে একত্রে আক্রমণ করলো। বিজয়ও তার অবস্থান নির্দিষ্ট করে আক্রমণ করতে করতে দুর্গে প্রবেশ করতে লাগলো। আকস্মিক আক্রমণে শত্রুদল ছত্রভঙ্গ হয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলো। দুদলের সংঘর্ষের এমন মুহূর্তে দুর্গে প্রবেশ করতে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালো বিজয়। কাদামাটি মিশ্রিত নোংরা পাজামা হাটু পর্যন্ত ভাঁজ করা, ছিঁড়াখোঁড়া গেঞ্জির উপরে সেকেলে আলখাল্লা গায়ে জড়িয়ে প্রাণপণে লড়াই করছে তার পিতা মহি। মহিকে প্রত্যক্ষ করে সম্মুখে অগ্রবর্তী হতেই মুহূর্তের মধ্যে একটি গুলি এসে বিদ্ধ করলো তাকে। মৃতপ্রায় বিজয়কে দেখে সামনের দিকে ছুটতেই শত্রুর অপর একটি গুলি এসে মহির বক্ষকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিলো।

সংকটময় রজনী কেটে গিয়ে ভোরের নতুন সূর্য উঁকি দিলো বাংলার আকাশে। দিগন্তপ্রসারী উজ্জ্বলতা রঙিন করে দিলো বাংলার বিভীষিকাময় রক্তাক্ত অলি-গলি। অত্যাচারীর বিনাশ, অত্যাচারের অবসান, অত্যাচারিতের নব জীবনের প্রতীক্ষা। লাল-সবুজ পতাকা হাতে ছুটলো বাংলার নর-নারী, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ-বনিতা। কেবল বিজয় ও মহির মতো অজস্র বিদেহী আত্মার নিঃশব্দ বিজয়োল্লাস বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।

নাইম হোসেন তামিম

আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial