ঢাকাসোমবার , ১৩ নভেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

তীরন্দাজ 

অংকন বিশ্বাস
নভেম্বর ১৩, ২০২৩ ৭:০৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

গাছের নিচে বসে তলোয়ারে শান দিচ্ছেন দ্রোণাচার্য। তলোয়ারের স্বচ্ছ ইস্পাতে তাঁর মুখ স্পষ্টই প্রত্যক্ষ হয়।  মুখে ও সর্বাঙ্গে দারিদ্র্যের ছাপ লক্ষণীয়। তবে তা অচিরেই ঘুচবে বলে আশাবাদী এই ব্রাহ্মণ। তার কারণ এই যে, হস্তিনা রাজ্যের কুরু রাজ তনয় গণের অস্ত্রশিক্ষার ভার গ্রহণ করেছেন তিনি। আগামী সপ্তাহ থেকে সেই কার্যক্রম শুরু হবে। রাজগুরু কৃপাচার্যই এই ভার গ্রহণ করতে পারতেন। তবে এ বিষয়প অনিচ্ছা ছিল গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের। ভীষ্ম চেয়েছিলেন ভরতকুলের পরবর্তী প্রজন্ম আরও কোনো যোগ্য শিক্ষকের কাছে অস্ত্রবিদ্যার শিক্ষা নিক। বিশেষত সেই যোগ্য শিক্ষক যে কে, তা নিয়ে দ্রোণাচার্যের মনে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। অবশ্যই সেই যোগ্য শিক্ষক ছিলেন ভরদ্বাজ মুনির পুত্র দ্রোণ। ভগ্নিপতির ভাগ্য উন্নয়নের কথা ভেবে এ বিষয়ে কৃপাচার্য দ্বিমত করেননি।

শুধুমাত্র কাকা হিসেবেই নয়, হস্তিনার প্রধান সেনাপতি হিসেবে ভীষ্মের উপদেশ গ্রহণ করেছিলেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র। উপরন্তু তিনি দ্রোণের যোগ্যতা নিয়েও নিঃসন্দেহ ছিলেন। এই জন্য দ্রোণের ওপর সেই গুরুভার অর্পিত হয়। যদিও দ্রোণের একটি শর্ত ছিল, যা তিনি ভবিষ্যতে বলবেন বলে ব্যক্ত করেন৷ তার সকল শর্ত মেনে নিতে রাজি হয় হস্তিনার রাজপরিবার। এসব কথাই মনে উদিত হতে থাকে দ্রোণাচার্যের।  সেই শর্ত ছিল একটি শর্ত, একটি প্রতিশোধ। শুধু যে দারিদ্রতা ঘোচানোর জন্য দ্রোণ এ প্রস্তাবে সম্মত হন, তা নই। তার মনের মধ্যে  কোনো এক কোণে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে, বহু বছর ধরে। সেই আগুন নিভবে একমাত্র প্রতিশোধের জলে। তার স্বপ্ন, প্রতিশোধ,আশা সবকিছু পূর্ণ হবে – এই ভেবে তার গোফের আড়ালে লোকানো চিকন ঠোঁটে একটু ঢেউ খেলতে দেখা গেল। একটু পরেই সেই ঢেউ মিলিয়ে গেল একটি ঘটনায়। তখন অপরাহ্নের শেষ ভাগ। নির্মল আকাশে সূর্যের অস্তায়নের লাল আভা। দ্রোণের কুটিরের প্রায় চারিদিকেই ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মাটিতে রবির শিখা বেশি পৌছায় না। দ্রোণের ঘোর ভাঙল একটি শব্দে। মাটিতে পড়ে থাকা শুকনে পাতায় পা দিয়ে চাপ দিলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক তেমনি। শব্দ শুনে দ্রোণের সতর্ক চোখ পড়ল সোজাসুজি। অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ল আসল একটি মানুষের অবয়ব। শুধুই যে অবয়বটির অস্তিত্ব স্পষ্ট হলো তা নয়৷ দ্রোণের কানে এলো বিনয়মিশ্রিত বালক কণ্ঠস্বর।

– “প্রণাম আচার্যদেব।”
ছেলেটির বেশ-ভুষা কেমন যেন আদিবাসী গোছের। দ্রোণের অভিজ্ঞ চোখ ছেলেটির গোত্র চিনতে ভুল করল না। ছেলেটির মাথায় পালকের মুকুট  ও অলঙ্কার, শরীরের ছাল,বাকল ও চামড়ার পোশাক দ্রোণকে সেই সত্যতার জানান  দিচ্ছে। একটু অবাক হয়ে দ্রোণ বললেন,
-“মঙ্গল হোক। কিন্তু কে তুমি বাছা?  তোমার নাম কি?  “
– ” আজ্ঞে, আমি নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র, একলব্য। “
-” হুম, সে তো বুঝলুম। কিন্তু তোমার এখানে আগমনের হেতু কি? “
একলব্য এইবার উত্তর দিতে প্রথমে সংকোচ বোধ করতে লাগল। হয়ত বলতে ভয় পাচ্ছে। কিন্ত দ্রোণাচার্য তাকে অভয় দিলে সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, ” আজ্ঞে…….. আজ্ঞে , আমি আপনার কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে চায়।”
কথাটি ব্রাহ্মণের কর্ণগেচর হলো ঠিকই, কিন্তু সেটি তার বিবেচনাধীন ছিল না। তাই কিছু সময় চুপ রইল, এই ভেবে যে ছেলেটা তার সাথে ঠাট্টা করছে কিনা।কিন্তু এ সাহস তাঁর হবে না। ব্রাহ্মণ, অর্থাৎ যিনি জ্ঞানী ব্যক্তি তিনি কারও প্রতি কর্কশ শব্দ প্রয়োগ করেন না।
ছেলেটি যা চাইছে তা আর্যসমাজ বিরোধী। তবুও দ্রোণ নিজেকে সংযত করে বললেন, ” দেখ বাপু, তুমি নিষাদ, অনার্য জাতি। তুমি হয়ত জানো না আর্য ব্রাহ্মণগণ অনার্যদের শিক্ষা দান করতে পারে না। তা সমাজবিরোধী ও অসম্ভব।  তাই তুমি বাড়িতে ফিরে যাও। উপজাতিদের শিক্ষা গ্রহণেই মঙ্গল। “
দ্রোণের কথা একলব্যের বুকে তীরের মতো বিঁধল। তবুও সে গুরুজনের মুখের ওপর দ্বিতীয়  কথা না বলে মাথা নিচু করে প্রস্থান করল।  যেভাব এসেছিল, সেভাবেই চলে গেল। কালো জঙ্গল তাকে বুকে টেনে নিল।
এদিকে সমাজ প্রদত্ত কর্তব্যের সমাধা করেও দ্রোণ শান্তি পেল না হয়ত। হয়ত একলব্যের মধ্যে তিনি অশ্বত্থামাকে দেখতে পেয়েছিলেন।  অশ্বত্থামা তাঁর একমাত্র সন্তান। কিন্ত কিছু করার নাই। সমাজের শৃঙ্খলে সে বাঁধা।
দ্রোণাচার্য আর তিলার্ধ সেখানে দাঁড়ালো না। তিনি ভেবেছিলেন ল্যাটা হয়ত এখানেই চুকে যাবে। কিন্তু তা হলে না।
এর কিছুদিনের মধ্যেই রাজকুমারদের প্রশিক্ষণ পুরো দমে শুরু হয়ে গেল।  পুত্রবৎসল ধৃতরাষ্ট্র সকল ব্যবস্থায় করেছেন। দ্রোণাচার্য  ধৃতরাষ্ট্রের মৃত ভাই পান্ডুর পুত্রদের বেশিই স্নেহ করতেন, কারণ তারা অধিকতর মেধাবী ছিলেন ও ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের মতো কুটিল ছিলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পান্ডুর ছেলেরাই তাঁর প্রতিশোধ পূরণ করতে পারবেন।
একদিন তিনি রাজকুমারদের নিয়ে গভীর অরণ্যে গেলেন প্রশিক্ষণের জন্য।  পরের দিন সকালপ ঘটল এক বিপত্তি।
দ্রোণের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি কুকুর আছে যেটি সবসময় দ্রোণের সাথেই থাকে। কিন্তু সকাল থেকে তার কোনো খোঁজ নাই। চারিদিকে লোক গেছে খুঁজতে।
ঘন্টা কয়েকের মধ্যেই ভীমসেন, অর্জুন ও নকুল কুকুরটির সন্ধান পেল। অর্জুন একটু চিন্তিত কণ্ঠেই বলল,” পেয়েছি গুরুদেব। কিন্তু…… “
কুকুরটি দ্রোনের খুব প্রিয়, তার সন্ধান পেয়ে দ্রোণের ম্লান মুখে হাসি ফুটেছিল। কিন্তু অর্জুনের কিন্তু কথা শুনে তিনি জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, ” কিন্তু কি অর্জুন?  বলো।”
“আজ্ঞে,  গুরুদেব  কুকুরটি ডাকতে পারছে না। কোনো আওয়াজ নাই। “
-“সেকি,!  তা কেন হতে যাবে,? কয়? দেখি।”
দ্রোণাচার্য পরীক্ষা করে দেখলেন৷ কেউ যেন সপ্তবাণ নিক্ষেপ করে কুকুরটির শব্দ নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। কিন্তু, এ কি করে হয়। এ বিদ্বে, এই এলাকাতে তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়াতে কুকুরটি দ্রোণের ইঙ্গিত কিছু বুঝত। দ্রোণের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে কুকুরটি একটি নির্দিষ্ট দিকে যাওয়া শুরু করল। জঙ্গলের ঈশান কোণে। ওদিকে জঙ্গল আরও ঘন৷ দ্রোণাচার্য, দুর্যোধন, অশ্বত্থামা, অর্জুন, যুধিষ্ঠির সহ অনেকে কুকুরের অনুগামী হলেন। তবে কিছু সময় যাওয়ার পর কুকুরটি যে স্থানে থামল, সেখানে জঙ্গল অনেক হালকা৷ তারা একটি কুটির সেখানে আবিষ্কার করল। সাথে আরও দুটি জিনিস লক্ষণীয় হলো। একটি মানুষ, অন্যটি মূর্তি। মূর্তিটি যে দ্রোণের তা বোঝা যাচ্ছে।
মানুষটিকে কেউ চিনল না, চিনল শুধু একজন৷ দ্রোণ৷ তার ভ্রু কুচকে গেল৷ কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছে না। দ্রোণের দ্বরাজ গলা বলে উঠল, ” তুমি নিষাধ রাজকুমার না? “
চোখ খুলেই বালকটি অধীর হয়ে উঠল। যেন হাজার বছরের সাধনার পর ভক্ত ভাগবানকে খুঁজে পেয়েছে। অধীর কণ্ঠেই সে উত্তর দিল, ” আজ্ঞে, গুরুদেব। “
-” তা তুমি এখানে কি করছ? তোমাকে তো চলে যেতে বলেছিলাম।  আর আমার এই কুকুররের অবস্থা কে করল?  “
– ” মার্জনা করুন গুরুবর, আমি জানতাম না যে ও আপনার কুকুর, আসলক ও এতল ডাকছিল যপ আমার একাগ্রতা নষ্ট হচ্ছিল৷ তাই আর কি…… “
– ” কিন্তু তুমি এ বিদ্যে শিখলে কোথা,? এ বিদ্যা তো আমি আর আমার গুরুদেব পরশুরাম ছাড়া আর কেউ জানে না। আর জানেন গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম। তাহলে তুমি কোথা থেকে শিখলে? “
– ” আপনার কাছ থেকেই তো শিখেছি। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আপনাকেই শুধু আমি গুরু হিসেবে গ্রহণ করব। তাই আপনার এই বিগ্রহ নির্মাণ করে তাতে নির্মাল্য অর্পণ করি, আর এখানেই অস্ত্রবিদ্যা চর্চা করি। আপনি যখন রাজকুমারদের অস্ত্র শেখান অথবা নিজে অস্ত্রের অনুশীলন করেন তখন আমি লুকিয়ে সেসব দেখি আর চর্চা করি। “
একলব্যের কথা শুনে দ্রোণের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়, এতো অধ্যাবসায়? এতো আগ্রহ এই ছেলের?  সে বুঝতে পারল যে, এই ছেলে বড় হলে অনেক বড় ধনুর্ধর হবে। এমনকি টেক্কা দেবে তাঁর প্রিয় শিষ্য ধনঞ্জয় অর্জুনকেও, যাকে সে কথা দিয়েছে যে, সে অর্জুনকে ভারতের সেরা তীরন্দাজ করবেন। কিন্তু এই ছেলেকে না থামালপ তাঁর কথার খেলাপ হবে। কিন্তু তা কি করে হয়?  এই ছেলেকে থামাতেই হবে। তাই একটু ক্রুধ্য স্বরে তিনি একলব্যকে বললেন, ” কিন্তু আমি তোমাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করব না। কারণ আমার বিদ্যা তুমি চুরি করেছ, তুমি তো চোর। উপরন্তু আমার দক্ষিণাও দাও নি।”
-” ওকথা বলবেন না প্রভু, আমায় ক্ষমা করুন। বলুন আপনি কি করলে আমাকে শিষ্য বলে স্বীকৃতি দেবেন? “
-” স্বীকৃতি চাও? গুরুদক্ষিণা দিতে পারবে?  তাহলেই তোমাকে শিষ্যের মর্যাদা দেব। “
-” বলুন কি দক্ষিণা চান।”
– ” ভেবে বলছ তো?  দ্রোণাচার্যের গুরুদক্ষিণা কিন্তু সহজ হবে না। একবাক্য দিতে হবে, কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। “
-” বলুন কি চান, একলব্যের সাধ্যের মধ্যে হলে আপনাকে অবশ্যই দেবে। “
এরপর তিনি যা চাইলেন তা কষ্মিনকালেও বোধ হয় কোনো গুরু তার শিষ্যের কাছে চাইবে না। এই নিষ্ঠুরতার কথা যাতে কেউ না জানতে পারে, এজন্য সবাইকে ওই স্থান পরিত্যাগের নির্দেশ দিলেন। সবাই চলে গেলে দ্রোণ বললেন, ” তোমার দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলটি আমাকে দান করো, আর এখান থেকে চিরজীবনের মতো প্রস্থসন করো। ” কথাটি বলতে দ্রোণের গলা একটু কাপল৷ বুদ্ধিমান এই দরিদ্র জানতেন যে ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল ছাড়া ধনুক চালানো অসম্ভব।
দ্রোণের কথা মুখ থেকে বের হবার সাথে সাথেই একলব্য তাঁর কৃপাণ দিয়ে তার বুড়ো আঙ্গুলটি দ্রোণের পায়ে সমর্পণ করে চলে গেল।  দৃঢ়চেতা এই বালকের গুরুভক্তিকে হয়ত দেবতারাও সম্মান করল।
আড়াল থেকে এসব ঘটনা দেখল আরেকজন। ভগবানতুল্য মানুষটিকে তার পাষাণ মনে হলো। যার জন্য দ্রোণ এত কিছু করল সেই হয়ত দ্রোণকে ভুল বুঝল। হ্যা, সে আর কেউ নয়, পাণ্ডুর তৃতীয় পুত্র, অর্জুন। এদিকে যে জিনিসটা এত দারিদ্রতা  ও কষ্টের দিনেও তাকে বিচলিত করতে পারেনি,অথচ  আজ তাকে করল। এক ফোটা অশ্রু।

অংকন বিশ্বাস
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (১ম বর্ষ,২০২২-২৩)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial