ঢাকামঙ্গলবার , ৭ নভেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

জেলখানায় তিনদিন 

মৃধা প্রকাশনী
নভেম্বর ৭, ২০২৩ ১:৪০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

গল্পটা আমার এক বন্ধুকে নিয়ে। তবে তাকে পুরোপুরি গল্প বলা যায় না। সেটা হলো জীবনের গল্প। জীবনের গল্প তো আর কল্পনা বা আবেগ দিয়ে হয় না। তবে আবেগ, কল্পনা দিয়ে সে গল্পটা বলা যায়। শত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়েই তো জীবনটা একটা গল্প, উপন্যাস, নাটকে পরিনত হয়।কেউ বা সে গল্প উপন্যাসের অভিনেতা, কেউ বা দর্শকশ্রোতা।

আসছে মঙ্গলবার থেকে পুজোর ছুটি। সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধুরা তাদের বড় পূজা খুব বড় করেই উদযাপনের জন্য অনেকে দেশের বাড়ি চলে গেছে। অনেকের আবার টিউশন বা পার্টটাইম চাকরিটার জন্য যাওয়া হয়ে উঠছে না। তবে ছুটিটা শুরু হলে কেউ আর পড়ে থাকবে না। তল্পিতল্পা নিয়ে ছুট দিবে মায়ের ডাকে। সকালের আধঘুম চোখে এসবই ভেবে যাচ্ছে নাসিম। বেলা অবশ্য পৌনে দশটা বাজে। নিয়ম করে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়ার দরুন নিয়ম করে দেরিতেই ঘুম থেকে উঠতে হয় তাকে। তবে যেদিন সকাল আটটার ক্লাস থাকে সেদিন জীবনপ্রাণ বাজি রেখে ঘুম থেকে উঠতে হয় তাকে। যত কষ্টই হোক, ওয়াহিদুল স্যারের ক্লাসটা মিস দিতে চায় না সে। এই একটা শিক্ষক যাকে নাসিম তার ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য শিক্ষকের চেয়ে একটু বেশিই শ্রদ্ধা-সম্মান করে। স্যার অবশ্য এ সম্মান শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য দাবিদারই। তাঁর মতো যে শিক্ষক হয় না। মায়া,ভালোবাসা দিয়ে নিজ সন্তান, ছোটভাই বোনের মতোই আগলে রাখেন তাঁর শিক্ষার্থীদের।

মা গতকাল রাতে ফোন দিয়েছিল নাসিম যেন পুজোর ছুটির হলেই দেশের বাড়ি চলে যায়। মা অবশ্য একটু গভীর রাতেই ফোন দিয়েছিলো।এতো রাতে মা কোনদিন ফোন দেয় না। নাসিম তাই একটু বিষন্ন ঘোরের মধ্যে আছে। বাবার কিছু হয়েছে কি? মাসুমের শরীরই বা ঠিক আছে তো! ক্লাসের কোন তাড়া না থাকায় শরীরটাকে আবারও বিছানায় এলিয়ে দেয় নাসিম। তবে ক্লাস আছে বেলা দেড়টার দিকে, রেবেকা ম্যামের ক্লাস। এই ভর দুপুরে ক্লাস থাকায় তার অন্যান্য বন্ধুরা চোটে থাকলেও রাগ হয় না নাসিমের। তার অবশ্য ভালোই লাগে। দেরিতে ঘুম থেকে উঠে বলে তার এ ভালোলাগা।
বেলা সাড়ে বারটা বাজতেই সে রওনা দেয় জহু হলে বন্ধু অনিকেতের কাছে।আজিমপুর থেকে জহু হলে হেঁটে যেতে তার মোটে দশ পনেরো মিনিট সময় লাগে। নাসিমের মুখটা ভার দেখে কোন কারণ জানতে চাইলো না অনিকেত। ইদানিং প্রায়ই নাসিমকে এ অবস্থায় দেখে সে। জিজ্ঞেস করলেও বলে ও কিছু না। রাত জেগে মুভি দেখায় শরীর, মুখের এ অবস্থা। কথাটার সিকিভাগও বিশ্বাস করে না অনিকেত। কারণ রাত জেগে মুভি দেখার ছেলে নয় নাসিম। তাই আজ তার মুখের এ বিষন্ন ভাব দেখেও চুপ থাকে অনিকেত। ক্যাম্পাসে গিয়ে অন্য সবাই হাসি তামাশায় মেতে থাকলেও চুপ আছে নাসিম।আশিক তাকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য বলে, কি রে শালা, বিড়ি খাওয়াবি আজ তুই। নাসিম নিঃসংকোচে  পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে আশিকের হাতে ধরিয়ে দেয়। নাসিমের কোন ভাবান্তর নেই দেখে আশিক বলে,কি হয়েছে রে তোর শালা? সবাইকে শালা বলে ডাকা আশিকের জন্মগত বুলি। একটা কৃত্রিম হাসি বন্ধুদের মাঝে ছুঁড়ে দিয়ে নাসিম বলে ঠিক আছি। পরক্ষণেই সে মিশে যায় অন্যদের মাঝে।

সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস থেকে ফিরেই বিছানায় শুয়ে পড়ে নাসিম। আজ যেন একটু বেশিই ক্লান্ত সে।মাথাটা ঘুরছে বোধহয়। তাই সুইচটা টিপে গভীর অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করে সে।
দিন দুই পরে পুজোর ছুটি হলে অন্যদের মতো সে-ও চলে যায় দেশের বাড়ি। ভোরের আলোয় পরিচিত অস্পষ্ট স্টেশনটা দেখেই অনিচ্ছায় হালকা কেঁপে ওঠে নাসিম। যেন একটু শীতলতার   পরশ বুলিয়ে দিয়ে গেল মৃদু বাতাস। ভ্যান গাড়িতে যেতে যেতে দু’ধারের সবুজাভ দৃশ্য দেখে মনটা নেচে উঠে তার। বাড়িটা উত্তরাঞ্চলের দিকে বলেই হয়তো এ সৌন্দর্য দেখার সুযোগ। উদ্যান ফসল কদাচিৎ দেখা মিললেও মাঠ ফসলের গন্ধে চারিদিকে যেন এক নতুন মাদকতার সৃষ্টি করেছে। বাড়িতে পৌঁছে মনটা একেবারে বিষন্ন হয়ে গেল নাসিমের। চারিদিকে সুনশান নিরবতা, বাড়িটা যেন মরুভূমির একখণ্ড দ্বীপ মনে হলো। রসকষহীন কাঠখোট্টা একটা বাড়ি।
বাড়িতে এসেই সে বুঝতে পারলো কেন তার মা তাড়াতাড়ি বাড়ি আসতে তাগাদা দিচ্ছিল। আর কেনই বা বাড়িটা আজ এতো এলোমেলো বিষন্ন ভাব। জমিতে ফসল কাটা নিয়ে নাসিমের পুরো পরিবারের নামে মামলা করেছে প্রতিবেশী আমজাদ শেখ। নাসিমের দাদা রহমত আলি এককালে বহু জমি কিনেন অন্যের থেকে। অন্যের সাথে শেয়ারিং করেও জমি কিনেন তিনি। বড় রাস্তার পাশে সেই শেয়ারিং জমির ফসল কাটা নিয়ে এ বিরোধ, মামলা। একসময় নাকি আমজাদ শেখ তার ইচ্ছেেতেই বা পাশের জমিটা চাষ করতো। আর নাসিমের বাপ চাচারা করতো ডান পাশের জমিটা। যেন এখন রাস্তার পাশে। আগে অবশ্য রাস্তা ছিলো না। কিন্তু এখন রাস্তা হওয়ায় আমজাদ শেখ জোর করে ডান পাশের জমিটা তথা রাস্তার পাশের জমিটা দখলে নিতে চায়, আর বা পাশেরটা দিতে চায় নাসিমের বাবাকে। নাসিমের বাবা এ প্রস্তাবে রাজি হয় না। এবং তাদের নিজস্ব জমিতে চাষকৃত গম কাটা নিয়ে শুরু হয় হাতাহাতি। বাবা সুরুজ আলি তাঁর লোকজন নিয়ে গম কাটলে তাঁদের নামে মামলা জুড়ে দেয় আমজাদ শেখ। অভিযোগটা হলো, তার জমি থেকে নাকি জোর করে ফসল কাটে নাসিমের বাবা। এ মামলা নিয়েই বাড়ির অবস্থা শোচনীয়, সবাই বিষন্ন।
বিকালে খাবারের পর নাসিম তার ক্লান্তভাবটা দূর করতে বিছানায় যেতেই বাইরে শুনতে পেল পুলিশ নাকি বাড়িতে আসছে। আমজাদ শেখ নাসিমের বাবা মা সহ বিশ জনের নামে মামলা করেছে। আর প্রধান আসামী করা হয় নাসিম,তার বড় ভাই হাফিজ আর চাচা শুকুর মিয়াকে। যদি প্রধান তিন আসামী পুলিশের সঙ্গে যায় তাহলে বাবা মা সহ অন্য আসামীদের ছেড়ে দেওয়া হবে। সেই অপ্রস্তুত বিকালে তাদের তিনজনকে নিয়ে গেল সদরের কারাগারে।

যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল।তাদেরকে রাখা হলো আরও পাঁচ-সাতজন নিম্ন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সাথে। নাসিমের কাছে এ সম্পূর্ণ এক নতুন পরিবেশ। রাতের খাবারে খুব বেশি কিছু না দিলেও পেট চালানোর মতো খাবার জুটলো তাদের। ডাল, ভাজি, ডিম দিয়েই সারতে হলো তাদের। অবস্থা বিপত্তি হলো ঘুমানোর সময়। একে তো ছোট রুম, তার উপর এতো মানুষ একসাথে ঘুমানো তো প্রায় অসম্ভব। আর নাসিম এমন জীবনে কোনদিন অভ্যস্ত নয়। ফাস্ট ইয়ারে তার অন্য বন্ধুরা হলের গণরুমে থাকলেও থাকেনি সে। শুনেছে সেখানেও নাকি এক রুমে বিশ ত্রিশ জন বা তার বেশি করে থাকে হয়। গণরুমে থেকে অভ্যস্ত নয় বলেই আজ এখানে থাকতে তার বড় কষ্ট হচ্ছে। তবুও থাকতে হচ্ছে। উপায় যে নেই।  কখনো কখনো মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না কিছু। তাকে মুখ বুঝে সহ্য করতে হয় চারপাশের ঘটমান সবকিছু।

পরের দিন সকালে নাস্তা দেওয়া হলো রুটি আর ডাল। এসব দিয়েই সকালের পেট চালিয়ে নিলো নাসিম। জেল সম্পর্কে আগেই একটু আধটু ধারণা ছিলো তার বাবা মায়ের। তাই মা আগে ছেলের পকেটে পাঁচশত টাকার একটা নোট রেখে দেয়। যাতে ছেলে জেলে দোকানপাট থেকে এটা ওটা কিনে খেতে পারে। কারণ, জেলখানার খাবার আর যাই হোক, উদরপূর্তি করবে না কখনও। নাসিমের আবার সিগারেট খাওয়ার বাতিক আছে কি না! অন্য খাবার চাচা ভাইয়ের সাথে খেতে পারলেও সিগারেট খাওয়ার সময় খুব ঝামেলা পোহাতে হয় তাকে। কোথাও বা গাছের নয়তো দেয়ালের আড়ালে গিয়ে নিঃশব্দে দু’তিন টানে শেষ করতে হয়। দিনে অন্তত পাঁচ সাতটা সিগারেট লাগতো তার। আর প্রতিবারই পড়তে হতো এ ঝামেলায়। দুপুরের খাবার অন্য বেলার খাবারের চেয়ে ভালো দেওয়া হলো। মুরগির মাংসের সঙ্গে দু-তিন রকমের ভর্তা ভাজি। মোটামুটি পেট পুরেই এবার খেতে পারলো নাসিম। খাবারের পর সবাই ঘুমাতে গেলেও গেল না নাসিম। এতো সংর্কীণ জায়গায় ঘুম আসবে না তার। তাই জেলের পরিবেশটা ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলো সে। অনেকটা বাড়ি বা বাজারের মতোই মনে হলো। প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে সেখানে। সেদিন রাতে খাওয়ার পর সবাই মিলে ভাগাভাগি করছে তাদের এখানে আসার গল্প। অধিকাংশ মানুষই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে এ কারাতে আজ আবদ্ধ। নাসিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে শোনার পর অবাকই হয় সবাই। হওয়ারই কথা। বলে, এ ছেলের নামেও মিথ্যা মামলার দায় পড়লো!! অথচ ঘটনা চলাকালীন সে ছিলো ঢাকাতে,নিজ পড়াশোনায় ব্যস্ত। অনেকে নাসিমের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করলো। এবং তাকে শোয়ার জন্য একটু বেশিই জায়গা ছেড়ে দিলো। ফলে গতরাতের তুলনায় আজ রাতে ঘুমটা একটু ভালো হলো তার। আজ সকালেই ঘুম থেকে উঠে গেল নাসিম। ফজরের নামাজ অবশ্য পড়েনি ইচ্ছে করেই। নামাজ রোজার পাশ কাটিয়েই চলতে অভ্যস্ত সে। তবে সবকিছুতে আল্লাহ ভরসা,ইনশাআল্লাহ বলে।
বাড়ি থেকে বাবা মা নিয়ম করেই দেখা করতে আসে তাদের সাথে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সন্তানদের মুক্ত করতে চান তাঁরা। ফলে উকিলকে বাড়তি কিছু দিয়েও রেখেছে সুরুজ আলি। আজ বলে গেল কাল নাকি ছেড়ে দেওয়া হবে তাদের। হাটাহাটি, পত্রিকা পড়েই দিনটা পার করলো নাসিম।

কারা কক্ষের মানুষগুলো যেন খুব অল্প সময়েই আপন হয়ে গেল তার। রাতটা যেন কাটতে চাইছে না। ছটফটানি ভাব। কাল সে মুক্তি পেতে যাচ্ছে এ বন্দীদশা থেকে, এ পোষা পাখির জীবন থেকে। অনেক কষ্টে শেষ রাতে ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুম ভাঙ্গতেই সকাল নয়টা বেজে গেল। বাবা উকিলসহ চলে এসেছে। দৌড়াদৌড়ি, ছুটাছুটি করতে করতে দম বেড়িয়ে আসছে তার। আইন আদালতের মামলা যে কতটা জটিল তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে নাসিম।  দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর শুনানি শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বলা গড়িয়ে তা আসরের পর শুরু হলো। জামিন হতে হতে রাত হয়ে গেল। অবশ্য নাসিমেরও ধারণা ছিলো যে সন্ধ্যার পরেই ছাড়া হবে তাদের। তবে এটাই শেষ মুক্তি নয়, মাঝে মাঝে হাজিরা দিতে হবে থানায়।
নাসিমের এই বাইশ বছরের জীবনে অনেক অভিজ্ঞতাই হলো। নতুন করে বক্সে যুক্ত হলো জেলখানার এক অজেয় অভিজ্ঞতা। জীবনে চলার পথে অনেক বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয় মানুষ। মানুষ হয় ঠকে না হয় ঠেকে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে লাভ করে এসব অভিজ্ঞতা। নাসিম কখনো কল্পনাও করতে পারে নাই যে তার মতো সুশিক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী জমিতে ফসল কাটা নিয়ে এমন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে যাবে। জীবন মানুষকে কতকিছুই না শিক্ষা দেয়! জহু হলের মাঠে বসে, অমাবস্যার অন্ধকারে বন্ধু অনিকেতের কাছে তার জীবনের গল্প বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠে নাসিম। অপরপক্ষে অনিকেতের করুণা, মায়াভরা ভালবাসার চাহনি নাসিমের কাছে অস্পষ্ট হয়ে উঠে তার ছলছল চোখের জলে।

হাবিবুর রহমান
দর্শন বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
01732309314
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial