ঢাকারবিবার , ৫ নভেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

দ্বিতীয় বিয়ে 

হীমিকা জান্নাত
নভেম্বর ৫, ২০২৩ ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

“তাহলে এটাই তোমার ফাইনাল ডিসিশন?”
“হ্যাঁ”
“আমার অনুমতি চাচ্ছো?”
“না, জানাচ্ছি তোমাকে।”
“তারিখ কবে ঠিক হলো?”
“এই মাসের পঁচিশ।”
“মেয়ে কি করে?”
“মেয়ে অনার্স শেষ করেছে কিছুদিন হলো। চাকরিবাকরি নেবে সামনে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না হলেও মেয়ে খুবই ভালো। ভদ্র, রুচিশীল। তোমার সাথে থাকতেও কোনো আপত্তি নেই।
আর দেখো, তুমি কষ্ট পেয়ো না। বাবা মার বয়স হয়েছে, আর আমিও তো মানুষ। এত কষ্ট করে রোজগার করছি, এসব কাকে দিয়ে যাব?
আর আমি তো তোমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছি না। তুমি যেমন আছো তেমনই থাকবে আমার সংসারে।”
“আর তোমার মনে?”
অরুণ কোনো উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। নিরূপমা বসে বসে ভাবতে থাকে অরুণের কথাগুলো। সত্যিই তো, আমাকে তো তাড়িয়ে দিচ্ছে না! এতটুকু দয়া তো দেখাচ্ছে।
অরুণ আর নিরূপমার বিয়ে হয়েছে আজ চার বছর হলো। চার বছরেও সন্তানের মুখ দেখতে পারে নি তারা। অনেক ডাক্তারও দেখিয়েছে। ডাক্তার বলেছে সমস্যাটা নিরূপমারই। ওদিকে অরুণের বাবা মা নাতি নাতনীর মুখ দেখার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছে। তাই অরুণের এই দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত।
নিরূপমা একটা স্কুলে পড়ায়, অরুণ একটা সরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। ভালোবেসে বিয়ে করেছিল তারা।যদিও অরুণের বাবা মা কোনোদিনই বিয়েটা খুশি মনে মেনে নেয় নি। নিরূপমার বয়সই তার কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী ছিল ওরা। অরুণের মা তো সুযোগ পেলেই আত্মীয়দের বলে বেড়ায়, “বুড়ি মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছি বলেই আজ এই অবস্থা। বাছা আমার এখনো ছেলেমেয়ের মুখ দেখতে পারল না।”
আত্মীয়েরা যদি বলে, “অমন করে বলছো কেন দিদি, বৌটি কি সুন্দর দেখতে, এমন রূপ তো আজকাল সচরাচর দেখা যায় না। গুণও কত।”
তখন নিরূপমার শ্বাশুড়ি মুখঝামটা দিয়ে বলে, “রাখো তো তোমার রূপের আলাপ। এই রূপ দেখিয়েই তো আমার ছেলের মাথাটা খেয়েছে। আর বলছো গুণের কথা? মেয়ে মানুষের যদি বাচ্চাই না হবে গুণ দিয়ে করব কি?”
শুরুর দিকে নিরূপমা কষ্ট পেতো। এখন মেনে নিয়েছে সবটা। এমন দিন যে আসতে পারে তা যে ভাবে নি তা নয়, তবে মানতে পারে নি যে অরুণ এমনটা করতে পারে।
সেদিন রাতে অরুণ আর নিরূপমার সাথে ঘুমাতে এল না। নিরূপমা শুয়ে শুয়ে ভাবছিল তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা, তাদের প্রেমের কথা। দিনগুলো একদম স্বপ্নের মতোই ছিল। তখন অরুণ একদিন তাকে না দেখতে পেলে কেমন পাগলের মতো হয়ে যেত। নিরূপমার এখনো মনে আছে, একবার সে অসুস্থ হয়ে ক্লাসে যায় নি বলে অরুণ সোজা তাদের বাড়ি চলে এসেছিল তাকে দেখতে। ভালোবেসে ও নিরূপমাকে নিরু বলে ডাকতো। প্রায়ই বলত, “যত ঝড়ঝাপটাই আসুক না কেন, আমি কোনোদিন তোমাকে ছেড়ে যাব না নিরু।” আর এখন!
পরদিন সকালে অরুণ দেখল নিরূপমা একদম স্বাভাবিক আচরণ করছে, যেন কিছুই হয়নি। তবে কি ও কাল রাতের কথাগুলোকে মজা ভেবেছে? ভাবছিল অরুণ। এমন সময় নিরূপমা এসে বলল, “তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া করে তৈরি হয়ে নাও, তোমার বিয়ের কেনাকাটা করতে যাব। মাকে ফোন করেছিলাম, মা বললেন তাদের আসতে আরও দুদিন সময় লাগবে। তুমি তো আবার ছুটির দিন ছাড়া সময় পাবে না। ভয় নেই, হিংসে করে খারাপ জিনিস পছন্দ করব না ছোট বউয়ের জন্য।” বলে নিরূপমা হাসল খানিকটা। সে হাসির পেছনে যে কতখানি কষ্ট লুকানো ছিল, তা হয়তো অরুণ দেখল, হয়তো দেখল না।
“নিরু, তুমি আর আমার ওপর রাগ করে নেই তো?”
“কি যে বলো না তুমি, রাগ কেন করতে যাব?তুমি হচ্ছো পুরুষ মানুষ,তোমার একজন বংশধরের প্রয়োজন তো বটেই। আর তুমি তো আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছো না, নিজের সংসারে বড় বউয়ের সম্মান দিচ্ছো।এই বা কম কী!”
“মেয়ের ছবি দেখতে চাও?”
“একেবারে বরণের সময় দেখব নাহয়। আর মেয়ে নিশ্চয়ই খুব সুন্দরীই হবে, তোমার পছন্দ বলে কথা।”
অরুণ আর বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। সেদিন সারাদিন তারা ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করল। নিরূপমা অনেক খুঁজে খুঁজে বউয়ের জন্য বেনারসি পছন্দ করল। লাল রঙের খুব সুন্দর একটা বেনারসি।
“তোমার মনে আছে, আমার খুব ইচ্ছে ছিল নিজের বিয়েতে লাল একটা বেনারসি পরার৷ কিন্তু পরতে পারি নি। তোমাদের বাড়ি থেকে একটা সবুজ শাড়ি দিয়েছিল, সেটাই পরতে হয়েছিল। তুমি বলেছিলে পরে আমাকে লাল বেনারসি কিনে দেবে। কই আর দিলে না তো?”
অরুণ চুপ করে রইল। নিরূপমাও আর কথা বাড়াল না। পরের কটা দিন খুব খাটাখাটুনি গেল ওর। বিয়ের সব কাজ ওকেই করতে হলো। আসলে ও ইচ্ছে করেই করল, নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য। মনে মনে ভাবলো, আর তো কটা দিন!
আত্মীয়দের অনেকে খুব দরদ দেখাল নিরূপমার জন্য। অরুণ যে খুব বড় অন্যায় করছে এটাও তারা বলল। নিরূপমা কিছু বলল না, হাসির আড়ালে সবকিছু চাপা দিতে চাইল।
বিয়ের দিন নিরূপমা নিজে হাতে অরুণকে বরের সাজে সাজালো।
“কি সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায়! আমার তো ছোট বউকে হিংসে হচ্ছে এখন। আমাদের বিয়ের সময় কিন্তু এত সুন্দর দেখায় নি তোমায়। অবশ্য সে বিয়েতে তো কোনো জাঁকজমক ছিল না। মামার ঘরে বড় হয়েছি, তারাও বিদেয় করে বেঁচে গিয়েছিল, আর তোমার বাবা মাও চান নি।”
“নিরু, পুরনো কথা থাক বরং।”
“হ্যাঁ, থাকুক। আর শোনো, এখন থেকে আমাকে আর নিরু বলে ডেকো না। ছোট বউ শুনলে কষ্ট পাবে।”
অরুণ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই সবাই চলে এল। অরুণকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
সানাই বাজিয়ে মহাসমারোহে অরুণ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চল। বাবা মাও খুব খুশি। অরুণ নিশ্চয়ই সেদিন অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নইলে সে কেন দেখতে পেল না নিরূপমা আর আগের নিরূপমা নেই। চোখের নিচে কালি পড়েছে, শরীর ভেঙে পড়েছে। কদিন ধরে কিছু খেতেও পারছে না। এসব কিছুই অরুণের চোখে পড়ে নি। সে তখন নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর। নিরূপমা ভাবল, ভালোই তো! সে তো ঠিক করেই ফেলেছে সে কি করবে। ওরা বরং ভালো থাকুক।
বিয়ে নির্বিঘ্নেই মিটে গেল। পরদিন অরুণ বউ নিয়ে বাড়ি ফিরল। বরণ করল নিরূপমা। তারপর নতুন বউকে ঘরে নিয়ে গেল। নতুন বউয়ের সব সেবাযত্নও সেই করলে লাগল। আত্মীয়রা ধন্যি ধন্যি করতে লাগল। সতিনকে এভাবে খুশি মনে মেনে নিচ্ছে, এমন মেয়ে আজকাল পাওয়াই যায় না।
নিরূপমার শ্বাশুড়ি বলল, “মেনে নিচ্ছে না ছাই! সব ওর কারসাজি, মানুষের চোখে ভালো সাজতে চাইছে।”
ওদের ফুলশয্যার খাটও নিরূপমাই সাজাল।নতুন বউকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ঘরে রেখে গেল। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
সে রাতে অনেকদিন পর খুব সুন্দর করে সাজল নিরূপমা। সিঁথি ভরে সিঁদুর পরল। তারপর ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে জিনিসটা বের করে আনল। সময় হয়ে গিয়েছে।
“ভালো থেকো, অরুণ!”মনে মনে বলল সে। তারপর শিশিটা খুলে এক নিমেষে খেয়ে নিল। কিছুক্ষণ পরই তার নিথর দেহ এলিয়ে পড়ল মেঝেতে।
অরুণ নিজের ঘরে এল। নতুন বউ বিছানায় বসে ছিল, সে গিয়ে তার পাশে বসল। ঠিক তখনই বেডসাইড টেবিলে চোখ গেল অরুণের। সেখানে একটা কাগজ রাখা। কাগজটা খুলে দেখল একটা চিঠি, নিরূপমা লিখেছে।
” অরুণ, আমি অনেক আগেই ভেবেছিলাম এমন দিন আসবে আমাদের জীবনে। তাই দেখো হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলাম সবটা।
জানো, এই চার বছরে আমার প্রার্থনা জুড়ে একটা জিনিসই ছিল, কোনোভাবে কি সবটা বদলে যেতে পারে না? একটা কোনো মিরাকল, হতে পারে না কি?
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ঠাকুর আমার প্রার্থনা শুনেছিলেন। মাসখানেক ধরেই নিজের মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। তাই সেদিন গিয়েছিলাম ডাক্তারের কাছে। ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরেই জড়িয়ে ধরব তোমাকে, তারপর খবরটা দেব।
অরুণ, আমি মা হতে চলেছি। ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছেন। আর তোমাকে বাবা মার কথা শুনতে হবে না। এবার সব ভালো হবে দেখো।
কিন্তু তোমার যে বড্ড তাড়া ছিল বাবা হওয়ার! তাই তো আমাকে কথাগুলো বলার সুযোগটুকুও দিলে না। দিব্যি জানিয়ে দিলে নিজের দ্বিতীয় বিয়ের কথা। একবারও ভাবলে না আমাদের ভালোবাসার কথা, এতগুলো দিন একসাথে থাকার কথা, তোমার করা প্রতিজ্ঞার কথা। তোমার কাছে সেদিন শুধু বড় হয়ে ধরা দিল তোমার বাবা মার কথা। শুধুই কি তাই? তুমি কি নিজে চাওনি? চেয়েছিলে। সে কারণেই এত নিষ্ঠুরভাবে কথাগুলো বলতে পেরেছিলে।
সেদিনই ঠিক করেছিলাম, আমাদের সন্তানের কথা আর তোমাকে জানাব না আমি। তোমার নতুন জীবনে কোনো কিছুর ছায়া পড়তে দেব না।তাই তো নিজে হাতেই সাজিয়ে দিলাম তোমার নতুন সংসার।
কিন্তু অরুণ, আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমার চোখের সামনে তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসবে, এটা যে আমি মানতে পারছি না।
বেঁচে থাকতে এ দৃশ্য আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। তাই সবচেয়ে সহজ রাস্তাটাই বেছে নিলাম। ভালো থেকো তোমরা।

ইতি
তোমার নিরু”

হীমিকা জান্নাত
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial