ঢাকারবিবার , ৫ নভেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

দুঃস্বপ্নের দুঃসাহস

মৃধা প্রকাশনী
নভেম্বর ৫, ২০২৩ ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মধ্য রাতে ঘুম ভাঙিয়া যাইবার পরেও বারান্দা ঘেষিয়া থাকা চাঁদের আলোর প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করিতে ব্যর্থ হইলো স্পৃহা। সে শুধু ভাবিতে লাগিলো এত রাত কখন হইয়াছে, আমি তো বিকেল বেলায় গোধূলি দেখিতে নদীর চরে গিয়াছিলাম। সাদা কাগজ ভর্তি চানামুঠ খাইতে খাইতে সেই যে কালী মন্দির পার হইয়া বৃষ্টি গাছের বাগানের ঘাসের উপর বসিয়া ছিলাম, তাহার পর তো কিছুই মনে করিতে পারিতেছি না। এইদিকে ঘরে আর কেহ নাই, শুধু হারিকেনের প্রদীপ শিখা নিবু নিবু করিয়া জ্বলিতেছে। ঘর হইতে বাহির হইলেই বিশাল একখান উঠান। জামগাছ তলে গেলেই গাছের ছায়ার কারণে সমস্ত উঠানের আলোকিত ভূমি দেখিতে পাওয়া যাইবে। কিন্তু ভয় করিতেছে বলিয়া সে আর ঘরের বাহির হইতে পারিলো না। এবার সে কাঁথা টা মুড়ি দিয়া আবার বিছানায় গা এলাইয়া দিলো। বৈকালের স্মৃতি টুকু মনে করিয়া শরীরে বার বার কাটা দিয়া উঠিল। কারণ সেই যে ঘাসের উপর বসিয়াছিল, চারদিক হইতে হঠাৎ এত বাতাস বহিতে শুরু করিলো। সে শুধু হতবাক হইয়া চাহিয়া রহিল।

ভাবিতে ভাবিতে নিদ্রা কখন তাহারে মুড়াইয়া দিয়াছে, বুঝিতে পারিলো না। কিন্তু এবার শুরু হইলো নূতন কিছু। গ্রাম ছাড়িয়া হঠাৎ সে শহরে উপবিষ্ট হইলো। সারা শহরে পূজোর বিরাট অবস্থা, কিন্তু স্ব শেকড়েও ফিরিয়াছে লক্ষ মানুষ। ছুটি শুরু হইবার কয়েকদিন পর রাজধানী থেকে মানুষের বাড়ি ফিরিবার আর তাড়া নাই। যাহারা যাইবার তাহারা গিয়াছে সেই ভীড় ঠেলিয়াই। কিন্তু স্পৃহা তখনও বাড়ি আসে নাই, সে আজ ভোরের ট্রেনে বাড়ি ফিরিবে। কিন্তু এইখানেই ঘটিলো এক বিরাট ব্যাপার। সে যখন ট্রেনে উঠিলো, তখন ট্রেনে কোনো মানুষ দেখা যায় নাই। এত বড় এক ট্রেন, অথচ সে একা। একটু পরেই ট্রেন ছাড়িয়া দিবে ঢাকা ছাড়িবার আশে। ট্রেন ছাড়িবার মুহূর্তক্ষণ আগে এত এত মানুষ দৌড়ে উঠিতেছে। চোখের পলকেই মানুষের ভীড়ে আর নিজেকেই খুঁজিয়া লওয়া ভার হইলো। ইতঃপূর্বে ট্রেনও তাহার সময়ানুযায়ী ছাড়িয়া দিলো। তাহার পর একে একে বেশ কিছু দুর্গতি তাহারে ভর করিলো। হঠাৎ স্পৃহা নিজেরে ট্রেনের বাহিরে আবিষ্কার করিলো। সে ভাবিতেছে কোনো এক স্টেশনে ইহা থামিয়াছে। সে দোকান হইতে খাবার নিবার আশায় চারিদিকে তাকাইয়া দেখিলো কোনো দোকানই নাই। তাহার পর সে যাহা শুনিলো তাহা শুনিবার অপেক্ষা তাহার অন্তর্যামীও জ্ঞানের অন্তরালে ভাবিতে পারে নাই। ট্রেন চলিয়া গিয়াছে অনেকক্ষণ আগেই এবং এইখানে নির্জন গাছপালার আচ্ছাদনে আশপাশে বাড়ি ঘর দেখা যাইতেছে না। সূর্য কেবল আলো দিতে শুরু করিয়াছে। কিন্তু গাছের ছায়ায় তাহা বুঝিবার খুব বেশি জো নাই। যে এক বৃদ্ধলোকের সহিত তাহার সাক্ষাত হইয়াছিল এবং সেই লোকই তাহারে খবরটা দিয়াছে।

অতঃপর, স্পৃহা সেই বৃদ্ধ লোকের সহিত তাহার বাড়ি গিয়াছে। বাড়িতে গিয়া বৃদ্ধের সহধর্মিণী স্পৃহা কে সান্ত্বনা দিতে গিয়া থামিয়া গিয়াছে। কারণ মেয়েটির মনে সেইরকম ভয় দেখিতেছে না। তাহার হাতে বাড়ি যাইবার খুব বেশি সম্বল নাই, তবুও মেয়েটি একদম দৃঢ়চেতা। সেইখানেই নিজ পরিচয় দিতে গিয়া এক ভদ্রমহিলার সুনজরে পড়িয়া স্পৃহা বাড়ি পৌঁছাইবার সুবিধা পাইলো। সবাই কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া স্পৃহা বিদায় লইবার কালে তাহাদিগকে একখানা ঠিকানা দিয়া আসিলো। যদি তাহারা কখনো রাজধানী গমন করিয়া থাকে, তবে যেন স্পৃহার সাথে যোগাযোগ করে। স্পৃহা এইবার দীর্ঘ পথ হাঁটিয়া মহাসড়কে উঠিয়াছে। বেলা তখন বেশ হইয়াছে। অক্টোবরের রোদ গায়ে খুব অস্বস্তি দেয় না, ভেতরে শক্তি কাজ করায়, যদিও কত ভাঙনের সাক্ষী এই অক্টোবর। দীর্ঘ ক্লান্তি অনুভব করিবার পরেও, তাহার মস্তিষ্ক কেবল বাড়ি পৌঁছাইবার তীব্র আনন্দটুকুই বহন করিতেছে। বাসে চড়িয়া বাড়ি যাইবার সময় ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে থাকা সাদা কাশফুলের সারি দেখিয়া মন ভরিয়া গিয়াছে তাহার। খুব কাছ থেকে একদম স্পর্শ করিয়া কাশ ফুলের স্মৃতি কে জীবনে একবারই ধারণ করিয়াছে। তাহার পর কখনো কাশফুল দেখিতে যাওয়া হয় নাই। সারাদিনের সমস্ত ঝামেলার মধ্য দিয়া অবশেষে স্পৃহা বাড়ি পৌঁছাইলো। মায়ের হাতের রান্না খাইবার জন্য কতদিন তাহার অপেক্ষা, আজ সেই অপেক্ষার অবসান। বাবা মা সহ পরিবারের সকল কে একত্রে দেখিবার আশায় মন টা কেমন মরে যাচ্ছিল, আজ মরে যাওয়া মনে প্রাণ ফিরিয়া আসিয়াছে। শখের সব খাবারই আজ প্রস্তুত হইয়াছে। নানান জাতের পিঠা-পুলি, আর তালের রসে বানানো পোয়া পিঠার স্বাদ টা মুখে লাগিয়া থাকিবে সবসময়।

সন্ধ্যা তখনো হয় নাই। সে ঘর হইতে বাহির হইয়া এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়াইয়া আসিলো। শহরে থাকিবার কালে গ্রামের গাছ গুলোকে তাহার খুব মনে পড়ে, এই গাছতলায় কত খেলার স্মৃতি। পড়ে গিয়ে কত ব্যথা সে পাইয়াছে, কত খেলার সাথী আজ তাহার হইতে কত দূরে অবস্থান করিতেছে। সবকিছু মনে করিয়া সে ঘরে ফিরিয়া যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটু বিশ্রামের তরে বিছানায় যাইবার উপক্রম করিলো, ঠিক তখনই তাহার ঘুম ভাঙিয়া গেলো। বুঝিতে পারিলো ভয়ানক এক স্বপ্ন সে দেখিয়াছে। কিন্তু ভাবিতেছে এই তো একটু আগেই আমি বাড়িতে ছিলাম, মায়ের হাতের এত রান্না করা খাবার খেয়ে সবার সাথে গল্প করছিলাম। গ্রাম টা একবার ঘুরেও দেখিয়াছে সে। বর্ষাকালের নদীর পানি কমিতে শুরু করিয়াছে। কিন্তু বাস্তব হইলো এই যে স্পৃহা তাহার নিজেরে নিজের ক্যাম্পাসে আবিষ্কার করিলো। ছুটি তো সবার জন্য নয়। ক্লাস শুধু বন্ধ রহিয়াছে। কিন্তু টিউশন দুইবেলা। টিউশন বন্ধ করিয়া বাড়ি যাইতে সে অপারগ। কারণ তাহার সমস্ত খরচ নির্ভর করে এই টিউশন এর উপর, বাড়ি হইতে সে খরচ লইবার সাহস পায় না। সংসারের খরচ অনেক, বাজারমূল্য ঊর্ধ্বগতি। টিকে থাকাটাই এখন পুরো সংগ্রাম এর উপর চলিতেছে।

এইদিকে সামনে পরীক্ষার রুটিন দিয়াছে, সেমিস্টারের বেড়াজালে আবদ্ধ হইয়া সময় এত কম পাওয়া যায় যে কুলাইয়া উঠিতে পারা যায় না। সবার ভেতর এক দমবন্ধ করা অস্বস্তি। একটু আগেও স্পৃহা গ্রামের রাস্তায় হাঁটিতেছিল, গাছপালা দেখিয়া চোখ জুড়াইতেছিল। কিন্তু এই শহরে গ্রামের সুন্দর সেই পরিবেশ নাই। এইখানে ছিল সবুজ মলচত্বর, এইখানে বসিলেই গাছের ছায়ায় মন জুড়াইতো। এইখানেই বসন্তে কোকিলের ডাকে মনে প্রেম জাগিতো। এই মলচত্বরের সবুজ ঘাস কে সাক্ষ্য রাখিয়া হওয়া প্রেম কলাভবনে পৌঁছাইতেই হারাইয়া যায়, ছিন্ন হইয়া যায়। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তের সাক্ষী এই মল চত্বরের মাঠ, এইখানের সমস্ত কৃষ্ণচূড়া গাছ। জীবনের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হইয়াছে স্পৃহা। কত ছুটি তাহার এই যান্ত্রিক শহর কাড়িয়া লইবে। কত সুন্দর ঘুমের স্বপ্ন তাহার ভাঙিয়া যাইবে টিউশন থেকে একটা ফোন কলের জন্য। সে স্বপ্নেও মায়ের কোলে মাথা দিয়া একবার গল্প শুনিতে পারিবে না।

ইসরাত জাহান সুমনা
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial