ঢাকাশনিবার , ৪ নভেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

ইবনে বাইতার; প্রকৃতিপ্রেমি এক মুসলিম বিজ্ঞানী

মৃধা প্রকাশনী
নভেম্বর ৪, ২০২৩ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ইসলামের সোনালি ইতিহাসে অনেক মুসলিম মনীষী বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে মুসলিম মনীষীরা অবদান রাখেননি। ইতিহাসে,বিজ্ঞানে,চিকিৎসায়, রসায়নে, সাহিত্যে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে প্রায় সবশাখায় মুসলিম মনীষীরা অবদান রেখে গেছেন। কিন্তু আমরা আমাদের সম্পদগুলোকে কালের গর্ভে হারিয়ে বসেছি। তারা অনেকটা আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে গেছেন। তাদের অবদানকে আমরা স্মরণ করছিনা। আমাদের মনীষীদের অবদান অন্যরা নাম বিকৃত করে বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে। আমরা তাদের ভুলতে বসেছি। যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অনবদ্য ভূমিকা রাখেন। তাদের একজন হলেন ইবনে বাইতার।

ইবনে বাইতার আমাদের মাঝে একেবারে অপরিচিত এক নাম। তাঁর পুরো নাম হচ্ছে আবু মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ মালেকি। তার গ্রামের নাম মালেকা। এটা আন্দালুসিয়ার অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রাম। জন্মস্থানের দিক দিয়ে তাকে মালেকি হিসাবে ডাকা হয়। তৎকালীন সময়ে একটা প্রথার মতো ছিলো যে, নামের শেষে জন্মস্থানকে শহরের নাম সংযুক্ত করতেন। যেমন- বুখারায় জন্মগ্রহণ করলে বুখারী, ইসপাহানে জন্মগ্রহণ করলে ইসপাহানী।ইবনে বাইতারকেও জন্মস্থানকে নামের সাথে সংযুক্ত করে মালেকি সাব্যস্ত করা হয়। তিনি মালেকি মাজহাবের অনুসারি ছিলেন এজন্য মালেকি বলা হয় এমন না। তাঁর পিতা ছিলেন দক্ষ পশু চিকিৎসক। পশু চিকিৎসককে আরবিতে বলা হয় বাইতার। এই বাইতার থেকে তাঁর উপনাম হয় ইবনে বাইতার। ছোট বেলা থেকে ইবনে বাইতার ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। এই প্রকৃতিপ্রেমে তিনি বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। আস্তে আস্তে প্রকৃতির সাথে তাঁর মিতালি খুব ভালোই জমে যায়। সারাদিন ঘুরে ঘুরে তিনি প্রকৃতি দেখতেন।  এই প্রকৃতি প্রেম থেকে তিনি আস্তে আস্তে উদ্ভিদ,গাছপালা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। প্রকৃতি নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়েন। ধীরে ধীরে আগ্রহী হয়ে উঠেন প্রকৃতির দিকে। বন-জঙ্গলই হয়ে উঠে তাঁর বিদ্যালয়। তবে এমন নয় য়ে, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তিনি সেভিলের পণ্ডিত আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ফায়াজ নাবাতির কাছে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের পাঠ শুরু করেন। ইবনে ফায়াজ নাবাতি ছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের উপর ভালো পণ্ডিত। ইবনে বাইতার দ্রুত সময়ের মধ্যে তার ওস্তাদকে ছাড়িয়ে যান। তিনি তৎকালীন সময়ে উদ্ভিদ গবেষণায় সবাইকে ছাড়িয়ে যান।

তৎকালীন মুসলিম মনীষীগণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জ্ঞান আহরণের জন্যে ভ্রমণ করতেন। ইবনে বাইতার ও তার ব্যতিক্রম নন। ইবনে বাইতারের মধ্যে জ্ঞানের প্রতি প্রবল আগ্রহ  ছিলো। তাঁর বয়স যখন ২০ বছর তখন তিনি বিভিন্ন দেশে সফরে বেরিয়ে যান। তিনি ছুটে যান গ্রিস, রোম, মরক্কো, মারাকেশ, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া, এশিয়া মাইনর, আনতাকিয়া, সিরিয়া, হিজায, গাজা, জেরুসালেম, বৈরুত ও মিশরে। এসব দেশে গিয়ে জ্ঞানী-গুণীদের সহচর্য লাভ করেন। তাদের সঙ্গে উদ্ভিদের প্রকার, বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেন। তিনি বিভিন্ন দেশের বনেজঙ্গলে গিয়ে ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করতেন। এমনকি উদ্ভিদ উৎপাদনস্থলও তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন গভীরভাবে। এ সম্পর্কে তাঁর সফরসঙ্গী আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ইবনে আবি উসাইবিয়া বলেন, ‘ দামেশকের বাইরে তার সঙ্গে বনেজঙ্গলে প্রচুর গাছপালা দেখেছি’। ইবনে বাইতার সুলতান আল-কামিলের শাসনকালে মিশরে অবস্থান গ্রহণ করেন। সুলতান তাকে নিযুক্ত করেন প্রধান ভেষজবিজ্ঞানী হিসাবে। তিনি ছিলেন উদ্ভিদ ও ভেষজ ওষুধের ক্ষেত্রে সুলতানের আস্থাভাজন। সুলতান আল-কামিলের ইন্তেকালের পর তিনি সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুবের অধীনে কাজ শুরু করেন। তার দরবারেও তিনি বেশ সমাদৃত ছিলেন। ইবনে বাইতারের ভ্রমণসঙ্গী ইবনে আবি উসাইবিয়া বলেন,’ আমি তাঁর কাছে ডায়োসকোরাইডসের মেটেরিয়া মেডিকা গ্রন্থের ব্যাখ্যা পড়েছি। তার বিস্তৃত জ্ঞান, মেধা, প্রজ্ঞা ও বিশ্লেষণক্ষমতা ও অনুধাবনশক্তি আমাকে মুগ্ধ ও সমৃদ্ধ করেছে। গ্যালেন, গাফিকি ও ডায়োসকোরাইডস-সহ এই শাস্ত্রের দিকপালদের গুরুত্বপূর্ণ বই নিয়ে আমি তার কাছে উপস্থিত হতাম।’

ইবনে বাইতার তাঁরপূর্বের এবং সমকালীন যারা গবেষক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী ছিলেন সকলকে তিনি ভালোভাবে অধ্যয়ন করেছেন।  মুসলিম গবেষকগণ এ বিষয়ে যেসব রচনা রেখে গেছে, সেসবও তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। ইবনে সিনা, আল-ইদরিসি, ইবনুল আব্বাস নাবাতি প্রমুখের গ্রন্থাদি তিনি পাঠ করেন এবং সেসব গ্রন্থের নিগূঢ় মর্ম ব্যাখ্যা করেছেন। আবার তিনি অধ্যয়নে থেমে যাননি এগ্রন্থগুলো শুদ্ধি  অভিযান চালিয়ে সংশোধন-সংযোজন ও সমালোচনা করেছেন বলে জানা যায়। রম ল্যান্ডো তার লেখা ইসহামু উলামাইল আরব ফিল হাযারাতিল উরুব্বিয়া গ্রন্থে বলেন, উদ্ভিদবিজ্ঞানে ইবনে রাইতারের অবদান ডায়োসকোরাইডস-সহ পূর্ববর্তীদের সকল অবদান ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব দশম হিজরি শতাব্দী পর্যন্ত বলবৎ ছিল ।
তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে – আল জামি লি মুফরাদাতিল আদভিয়া ওয়াল আগযিয়া’ (ঔষধপত্রের শব্দকোষ)। ইবনে বাইতার এই বইয়ে কোন উদ্ভিদ থেকে কোন ঔষধ তৈরি হয় সেগুলো বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রতিটি উদ্ভিদের আলাদা আলাদা গুণ, ঔষধের উপকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ বর্ণনা করেছেন। প্রত্যেক জায়গায় তিনি সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন। তার বইয়ের আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিলো তিনি বইয়ে উদ্ভিদের ঔষধের নাম লিখতেন তারপর সেগুলোর বর্ণনাও করে দিতেন। ফলে, বিশ্ববিল্পবের আগ পর্যন্ত এই বইই ছিলো ইউরোপের চিকিৎসা বিজ্ঞানের একমাত্র ভরসাস্থল।  তিনি এ বইয়ে প্রায় ১৪০০ ঔষধের নাম লিখেন বলে জানা যায়। যারমধ্যে ৩০০ টি তাঁর নিজের আবিষ্কার। ইবনে বাইতারের আরেকটি গ্রন্থ ‘আল মুগনি ফিল আদভিয়াতিল মুফরাদা’ আছে, যেখানে তিনি বিভিন্ন অঙ্গের চিকিৎসা ও ঔষধের কথা উল্লেখ করেন।

ইবনে বাইতারের বিষয়ে ইউরোপীয়রা সাক্ষ্য দিয়েছে ইবনে বাইতার ছিলেন তৎকালীন আরব বিশ্বে শ্রেষ্ঠ লেখক এবং ভেষজ উদ্ভিদবিশারদ। তিনি ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।  ইবনে বাইতার ইন্তেকাল করেন ১২৪৮ খ্রিস্টাব্দে দামেস্ক শহরে। তাঁর কর্ম আমাদের মধ্যে এখনো অমর হয়ে আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে উদ্ভিদের নানান রকমের ঔষধ উৎপাদনে ইবনে বাইতার পৃথিবীর ইতিহাস এক বিরল সাক্ষর রেখে গেছেন। মুসলিম মনীষীগণ ইতিহাসে যেসব আমাদের জন্য গৌরবময় অধ্যায় রেখে গেছেন। সেগুলো আমাদের জানা উচিত তাঁদের অবদান স্মরণ করা উচিত।

নাম: ইমরান উদ্দিন।
প্রতিষ্ঠান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিভাগ: আরবি
ইমেইল- emranuddin491@gmail.com

Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial