ঢাকাশনিবার , ২১ অক্টোবর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

ইসলামি স্বর্ণযুগে মুসলমানদের শিক্ষা 

মৃধা প্রকাশনী
অক্টোবর ২১, ২০২৩ ১০:০৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

 

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা মূলতঃ একটা জাতিকে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সচেতন হিসেবে তৈরি করে। একজন ব্যক্তিকে তার পরিচয় খুঁজতে শেখায়। সেই হিসেবে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তৈরি করে দেওয়া এবং জ্ঞান বিতরণ ও উৎপাদন করা।


বর্তমানে মুসলমানদের নাজেহাল অবস্থার পিছনে একটা অন্যতম কারণ হলো মূল্যবোধ তৈরির প্রতিষ্ঠান আর জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান পৃথকিকরণ। এটার প্রভাব যে শুধু মুসলিম বিশ্বে পড়েছে তা না, বরং বর্তমান পুরো বিশ্বই এর নেগেটিভ ইফেক্টের শিকার। এটা কিভাবে হলো সেটা আজকের আলাপ না, তবে এর আগে, অর্থাৎ ক্লাসিকাল যুগে ইসলামি প্যারাডাইমের ভেতর শিক্ষাব্যবস্থা কেমন ছিল সেটার উপর কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে আজকে।


আমরা ইসলামি স্বর্ণযুগের অনেক স্কলারের কথা হয়তো শুনেছি। তাদের যোগ্যতা দেখলে স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। একাধারে তারা রিলিজিয়াস এবং র‍্যাশনাল সায়েন্স উভয়তেই পারদর্শী ছিলেন।


ইবনে সিনা। তার বিখ্যাত “আল কানুন ফিত তিব্ব” কে চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল বলা হয়। তার লিখিত “আশ শিফা” কিতাব ৪টা টপিকে বিভক্ত: লজিক, ফিজিক্স, মেটাফিজিক্স এবং ম্যাথম্যাটিকস। ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসা ও দর্শন সবক্ষেত্রেই পারদর্শী ছিলেন।


ফখরুদ্দিন আল রাজি। হয়তো অধিকাংশই না-ও চিনতে পারেন। তার বিখ্যাত তাফসীর “মাফাতিহ আল গাঈব”, ইংরেজিতে যেটা The Great Tafsir হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৯ খন্ডে বিভক্ত; প্রত্যেকটা আয়াতের লজিক্যাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তাকে ঘিরে আলাদা একটা ধর্মতত্ত্ব গড়ে উঠেছিল তৎকালীন সময়। ইসলাম, বিজ্ঞান ও দর্শন তিন বিষয়েই তিনি স্কলার ছিলেন।[‘Fakhr al-Din ar-Razi’ in M M Sharif, A History of Muslim Philosophy] তিনি একটা মেডিকেল এনসাইক্লোপিডিয়া লিখেছিলেন “আল তিব্ব আল কাবির” নামে, যদিও মৃত্যুর পূর্বে শেষ করতে পারেন নি। তিনি ইবনে সিনা ও আবু বকর আল রাযির মেডিকেল বইগুলোর ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। তার একটা বৈজ্ঞানিক এনসাক্লোপিডিয়াও আছে “জামি আল উলুম” নামে, যেখানে একাধারে ফার্মাকোলজি, অ্যারিথম্যাটিক, আলজেব্রা, অপটিক্স ইত্যাদি প্রায় ৪০টা সাবজেক্ট নিয়ে লিখেছেন। তিনি বিজ্ঞানকে ৬০ ভাগে বিভক্ত করেছিলেন।[Sayyed Hossain Nasr, Science and Civilization] তার “হাদায়িক” নামক কিতাবে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের আলোচনা পাওয়া যায়।


এমন স্কলারদের তালিকা অনেক লম্বা। এভাবে লিখে শেষ করা হয়তো গেলেও অনেক লম্বা হয়ে যাবে আর্টিকেল। মাত্র দুইজন স্কলারের কথা আলোচনা করলাম। এদের নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত পড়লেই দেখবেন, কোনো টপিক বাদ পড়ে নাই। দুইজনেই র‍্যাশনাল এবং রিলিজিয়াস উভয় জগতের সবকিছুর উপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। কিভাবে এরকম সম্ভব হলো সেটা জানার জন্য আমাদেরকে তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জানতে হবে।


ইসলামী স্বর্ণযুগের মাদ্রাসা আর বর্তমান যুগের বিশ্ববিদ্যালয়কে আমি একই ক্যাটাগরিতে ফেলতে রাজি না, যদিও অনেক একাডেমিক সেসব মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাটাগরিতে ফেলেছেন। তখনকার মাদ্রাসার সাথে এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতি ভিন্ন, উপকরণও ভিন্ন ছিল। ইনপুট ভিন্ন, আউটপুটও ভিন্ন। কাজেই দুইটার ক্ষেত্রে আলাদা টার্ম ব্যবহারই কাম্য।


জমানার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলতঃ কর্পোরেট বিন্যাসব্যবস্থার অনুকরণে নির্মিত। এখানে নির্দিষ্ট কারিকুলাম, এবং শেষ করার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বিদ্যমান। অন্যদিকে ক্লাসিকাল মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অনেকটা বিকেন্দ্রীক এবং তরল। নির্দিষ্ট টেক্সটের উপর ইজাযা বা অনুমোদন দেওয়া হতো এবং অধ্যয়ন শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না।[George Makdisi, ‘Madrasa and University in Middle Ages’, Studia Islamica, No. 32 (1970)]


কলোনিয়াল শাসন-পূর্ব ইসলামী বিশ্বে মাদ্রাসাগুলোতে পঠিত বিষয়গুলো “উলুমুল মা’কুল” বা যুক্তিসংক্রান্ত জ্ঞান এবং “উলুমুল মানকুল” বা রেওয়ায়েতকৃত জ্ঞান, এ দুয়ে বিভক্ত ছিল। [Francis Robinson, ‘Ottomans-Safavids-Mughals: shared knowledge and connective systems’, Journal of Islamic Studies 8, no.2 (1997)]


উলুমুল মা’কুলে কুরআন, হাদিস, ফিক্বহ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার, সমাজতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত কিতাব “আল মুকাদ্দিমা” তে তার সময়ে উলুমুল মানকুল এর আওতায় যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, জ্যামিতি, পাটিগণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, বীজগণিত, আলোকবিদ্যা ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যেগুলো আজকের দিনে শিক্ষাব্যবস্থায় সেকুলার বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বিজ্ঞান হিসেবে পরিগনিত হয়। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় “কুরআন শিক্ষা” কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতো। [Ibn Khaldun, Al Muqaddimah: An Introduction to History, translation. Franz Rosenthal, Princeton University press, 2005]


কলোনিয়ালপূর্ব মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা শুরু হতো কুরআন হাদিস দিয়ে। শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষা, কুরআন, হাদিস, সাহিত্য, গণিতশাস্ত্র, ধর্মীয় ব্যবহারিক বিষয় ইত্যাদি শেখানো হতো। এছাড়াও ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিক্বহের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হতো। এই শিক্ষাগুলো সাধারণত মসজিদকেন্দ্রীক ছিল, এবং এই রীতি সাহাবিদের যুগ থেকে প্রচলিত ছিল। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে ওমর, মুয়াজ ইবনে জাবালসহ অনেক প্রখ্যাত সাহাবি ছিলেন যারা বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদে দারস প্রদান করতেন। উমাইয়া আমল পর্যন্ত এই রীতি টিকে ছিল। এখানকার শিক্ষা ছিল মৌখিক বক্তব্যভিত্তিক এবং আলোচনাভিত্তিক। এই ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি থেকেই মালিক বিন আনাস, শাফেয়ী, মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানি প্রমুখ বিখ্যাত স্কলার তৈরি হয়েছিলেন। যেহেতু আলোচনা এবং মতানৈক্যের সুযোগ ছিল, ফলে এ ধরনের শিক্ষাপদ্ধতিতে চিন্তার পূর্ণ দক্ষতার প্রতিফলন দেখা যেতো এবং ফলাফলস্বরূপ বিখ্যাত তাফসীরকারক, ফকীহ, মুহাদ্দিস তৈরি হয়েছিলেন। যাই হোক,পরবর্তীতে উমাইয়া যুগের শেষের দিকে আলাদাভাবে শিক্ষালয় গড়ে ওঠে।


ফিক্বহের ক্ষেত্রে আরেকটু উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১১ শতকের দিকে পারস্য এবং ইরাকে বিভিন্ন শিক্ষালয় স্থাপন করেন বিখ্যাত সেলজুক উজির নিজামুল মুলক। তিনি উলুমুল মানকুল ও মা’কুল উভয়ের সমন্বয়ে সিলেবাস প্রণয়ন করলেও মানকুলের ক্ষেত্রে ফিক্বহকে কেন্দ্রে রেখেছেন। এই সময় অনেক মাদ্রাসাতে ৪ মাজহাবের ফিক্বহই শেখানো হতো।[Makdisi 1986] ফলে যাচাই-বাছাইয়ের দক্ষতা গড়ে ওঠে। ইখতেলাফের জন্ম দেয়। গবেষণায় উন্নতি দেখা যায় আগের তুলনায়। প্রাথমিক যুগে যারা ইখতেলাফ নিয়ে কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ আস সায়বানি, ইমাম শাফেয়ী ও ইবনে জারীর আত তাবারির নাম উল্লেখযোগ্য। তাবারির “ইখতিলাফুল ফুক্বাহা” গ্রন্থটা উল্লেখযোগ্য যা সেই সময়ে বিভিন্ন মাদ্রাসার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত ছিল।


তবে দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসাগুলো থেকে সামাজিক রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুর কারণে তুলনামূলক ফিক্বহ হারিয়ে গেছে বহু আগেই। বর্তমান বেশিরভাগ মাদ্রাসাগুলোতে শুধুমাত্র এক মাজহাবের ফিক্বহকে কেন্দ্র করেই শিক্ষা শেষ করে।


র‍্যাশনাল সায়েন্সের আলোচনা ফিলোসোফি দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। শুরুর দিকে দর্শনকে হারাম মনে করা হতো এবং দার্শনিকরা সমাজে নাস্তিক হিসেবে পরিচিত ছিল কারণ তারা ন্যাচার বা প্রকৃতিকে সর্বোচ্চ কতৃপক্ষ বা সুপ্রিম অথরিটি হিসেবে ধরতো। [Tritton 1957] যাহোক, পরবর্তীতে আস্তে আস্তে আক্বিদাসহ কিছু ক্রিটিকাল বিষয় বিশ্লেষণের স্বার্থে কালামশাস্ত্র ইসলামিক থিওলজি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। মানুষ প্রথম ভাবতো যে ফিলোসোফি চর্চার ফলে সংশয়বাদী হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে, কিন্তু পরে যখন ধর্মীয় বিভিন্ন ব্যাখ্যা যুক্তির আলোকে দেওয়া শুরু হলো, তখন আস্তে আস্তে মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলো। এভাবে পরবর্তীতে গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয়। ৯ম শতাব্দীর শুরুর দিকে আব্বাসী আমলে “মুতাজিলা” নামক একটা দর্শনভিত্তিক ফিরকার আবির্ভাব হয়, যারা ইসলামের সমস্ত বিষয়কে যুক্তির আলোকে যাচাই-বাছাই করতো। মুতাজিলা স্কলার বিখ্যাত দার্শনিক আল কিন্দি প্রথম এরিস্টটল এবং প্লেটোর দর্শনকে ইসলামাইজ করার দ্বারা ইসলামি দর্শনের নতুন পথ উন্মোচন করেন। তাছাড়া অন্যান্য দার্শনিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হচ্ছে ইমাম আল গাজালী, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে সিনা, আল ইদ্রিসী, ইবনুল আরাবি প্রমুখ।


মসজিদভিত্তিক শিক্ষালয়গুলোতে কুরআন হাদিস ফিক্বহ পড়ানো হলেও পরবর্তীতে অন্যান্য র‍্যাশনাল সায়েন্সও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে স্টাডি হতো। তৎকালীন সময় খেলাফতের বড় বড় মসজিদগুলোতে লাইব্রেরি থাকতো যাতে ফিলোসোফি, ইতিহাস, জ্যামিতি, সঙ্গীত, মেডিসিন ইত্যাদি প্রায় সকল বিষয়েরই পুস্তক সংরক্ষিত থাকতো। আব্বাসী খলিফা আল মামুন ৮৩০ সালে “বাইতুল হিকমা” নামে একটা শিক্ষালয় স্থাপন করেন র‍্যাশনাল সায়েন্সের চর্চার জন্য। এখানে একাধারে গবেষণা এবং অনুবাদকার্য সম্পাদন করা হতো।[Sourdel 1986] ফাতিমীয় খেলাফত আমলে কায়রো রাজপ্রাসাদে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি ছিল। প্রায় ৪০টা কক্ষ ছিল বইয়ের, যেখানে সব ধরনের কিতাবের সমাহার ছিল। শুধুমাত্র প্রাচীন বিজ্ঞানের উপরই প্রায় ১৮০০০ কিতাব ছিল। [al-Maqrīzī, ii, 253-5] ফাতিমীয় খলিফা আল হাকিম ১০০৫ সালে “দারুল হিকমা” প্রতিষ্ঠা করেন যাতে লাইব্রেরি এবং পড়া ও গবেষণার জন্য আলাদা কক্ষ ছিল।


মুসলিম বিশ্বে শিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষা সাহিত্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর অন্যতম একটা কারণ হলো রিলিজিয়াস টেক্সট বুঝার জন্য সেসব ভাষা এবং সাহিত্যের উপর অগাধ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তাফসীরের উসুলের মধ্যে অন্যতম একটা পয়েন্ট হচ্ছে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী হওয়া। ফলে আরবি ভাষা ও সাহিত্যকে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হতো। মদিনার মসজিদে সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব কাব্যচর্চা করতেন লোকসমাগমে। ইমাম শাফেয়ী কবিতার চর্চাকে মানুষের স্বভাবের পরিশুদ্ধি বলে আখ্যায়িত করেছেন। [Ibn `Asākir 4] বাগদাদে মাদ্রাসা-ই-নিজামিয়্যাহ তেও ভাষাতত্ত্বের শিক্ষা দেওয়া হতো। ১২০৭ সালে জেরুজালেমের শেখরা মসজিদে সাহিত্য চর্চাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল মাদ্রাসা-ই-নাহবিয়্যাহ। [Sauvaire, Hist. Jér. Et Hébr.] পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসাগুলোতেও আরবি ও ফারসি ভাষা ও সাহিত্য কারিকুলামে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।


মোটাদাগে ক্লাসিকাল ইসলামি বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থা মূলতঃ তিন ধাপে ছিল। প্রথমতঃ প্রাথমিক ধাপ যাতে শিক্ষার্থীদের কুরআন, হাদিস, গণিত, ভাষা ইত্যাদি শেখানো হতো। দ্বিতীয় ধাপে শিক্ষার্থীরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী কোনো বিষয়ের উপর উস্তাদের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করতো। তৃতীয় ধাপে গবেষণা শুরু করতো। গবেষণার জন্য আলাদা মানমন্দির নির্মিত হয়েছিল বিভিন্ন খেলাফত আমলে। বাইতুল হিকমা (৮৩০ খ্রি), দারুল হিকমা (১০০৫ খ্রি) উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে। [Makdisi 1986]


দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম অঞ্চলে বহু আগে থেকেই উলুমুল মা’কুল বাদ দেওয়া হয়েছিল। কারণ মুঘল পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জাতির শোষণ ও উপনিবেশের ফলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যেই আগ্রাসন শুরু হয় তাতে ইসলামের স্বতন্ত্রতাই হারিয়ে যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় ইসলামি শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতি রক্ষার অপরিহার্যতা চিন্তা করে উলুমুল মানকুল কেন্দ্রীক মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ, পাকিস্তানের দারুল উলুম করাচি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।


যাহোক, প্রি-কলোনিয়াল যুগে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাকে প্রসারিত করেছিল, নিত্যনতুন আবিষ্কারের পথ উন্মুক্ত করেছিল। সময়ের অপচয়কেও রোধ করেছিল; ইবনে বতুতা মাত্র ২১ বছর বয়সে কাজির পদ অলঙ্কিত করেন, ইবনে খালদুন মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলামি আইনশাস্ত্রে গ্রাজুয়েট হন। অথচ কলোনিয়াল উত্তরোত্তর মুসলিম বিশ্বে বর্তমানে দীর্ঘ সময়ের শিক্ষার আউটপুট হিসেবে শুধুমাত্র জেনারেলিস্ট উৎপাদন ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। তাই আমাদের বর্তমান মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্দশার দিকে লক্ষ্য করে সংস্কারের একটা প্রস্তাবনা আনা প্রয়োজন।

নাফি’ বিন মামুন 

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Phone: 01642176103
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial