ঢাকাশুক্রবার , ২০ অক্টোবর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

সতী

মৃধা প্রকাশনী
অক্টোবর ২০, ২০২৩ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সূর্য পাটে গিয়েছে বেশ খানিকটা সময় হলো।  বৈঠকখানার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একটি কথা মাথার মধ্যে খুব ঘুরছিল। মানুষ একে দার্শনিক চিন্তাও বলে। পরিবর্তন সত্যই সংসারের নিয়ম,এই কথাটি বহু বৎসর পূর্বে শ্রীকৃষ্ণ বললেও,তা অনেকেই আমরা মেনে নিতে পারি নে। শাসক, শাসন সবকিছুর সাথে সমাজের নিয়মেরও পরিবর্তন ঘটে। কখনো এই পরিবর্তন সমাজের জন্য মঙ্গলকর, আবার কখনও ক্ষতিকর। সাধারণত সমাজে কোনো প্রথার সৃষ্টি হয় সমাজ ও কৃষ্টির ভালোর জন্য। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম মূর্খের মতো, কোনো মমার্থ না বুঝে যখন সেই প্রথা পালন করে শুধুমাত্র অবশ্য কর্তব্য হিসেবে, তখনই সেই প্রথা কুসংস্কারে রূপ নেয়, যা সমাজে আশির্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।  বর্তমানে এই ভারতবর্ষে কতশত কুসংস্কার রয়েছে, যা ব্যক্তি জীবনকে দূর্বিষহ করে তুলেছে। সেগুলোকে উৎখাত করা অতিব জরুরি।
আজ পূর্ণিমা, কিন্তু সেই পূর্ণিমার আলো পৃথিবীর মাটিতে পড়ছে না। কালো মেঘে ঢেকে গেছে পুরা আকাশটা। জানালার বাইরের পৃথিবীটাকে একটু বেশিই অন্ধকার লাগছে যেন। আমার বাড়ির পাশের আমগাছটা থেকে ডাহুক ডাকছে অনবরত।  হয়ত গতকালের ঝরে সে তার সন্তান হারিয়ে শোকার্ত। দূর থেকে কীর্তনের মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছে। চারিদিকটা শশ্মানের মতো নিঃশব্দ। যেন মহাপ্রলয়ের পরের অবস্থা।
নিস্তবদ্ধতা ভাঙল হারানের ডাকে, ” কত্তা, একজন দেখা কত্তে এয়েচে। পাইঠে দেব? “
ক্ষণিক বিরক্ত হলুম, এমন অসময়ে কে আবার আসল?  তারপর ভাবলুম, এমন পরিবেশে খুব দরকার না থাকলে কারো আসার কথা নয়। হয়ত কেউ বিপদে পড়েই এসেছে। একটু ব্যস্ত হয়েই শুনলুম, ” কে “।
এরপর উত্তর যা আসল তা শুনে রাগব না বিরক্ত হবো তা বুঝতে পারছিলুম না। উত্তরে হারান বললে, ” আজ্ঞে, এক বামুন ঠাকুর। কুলীন বামুন, আপনার সাথে দেখা করার জন্য খুব পীড়াপীড়ি কত্তে লাগলে।  এক পেকার অন্দরে ঢুকে আসার মতো অবস্থা। ভাগ্যিস লেঠেল সদ্দার ফটকে ছেল, নইলে ঢুকেই পড়ত বোধ হয়। “
এবার সত্যি রাগ হলো, ভদ্রতা বলতে কিছুই নাই দেখছি। নিজেদের আবার বর্ণশ্রেষ্ঠ দাবি করে। কড়া গলায় বললুম, ” কেন?  কি দরকার? “
-” তা জানি নে বাবু, তবে এ ঠাকুরকে দেখে অন্য পাঁচটা দেমাগী বামুনের মতো লাগলো নে, বিপদে পড়েই এয়েচে হয়তো বা। “
– ” আচ্ছা পাঠাও, কি দরকার তা কে জানে, এমনিই আমার সতীপ্রথা বন্ধ করা নিয়ে ক্ষেপে আছে। দেখ গে, হয়তো কোনো ফরমান শোনাতে এসেছে। বেশি সময় যেন না নেয়। “
হারান মাথা নেড়ে চলে যাওয়ার একটু পরেই সে এলো। আমি চারপায়াতে বসে পড়ছিলাম।  সে এসে নমস্কার দিল। আমিও প্রতি নমস্কার জানালাম।  হারানের বর্ণনাই খাদ নাই। সত্যি ইনি অন্যদের থেকে আলাদা। নিরীহ মুখ, তবে গরিব। পরনে ময়লা ধুতি, নামাবলি, উষ্কখুষ্ক চুল, দেখে বিধ্বস্ত মনে হলো।  এসে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, কথা বলতে বোধ হয় ইতস্তত করছে। তাই আমি বললুম, ” কি দরকারে আসলেন ঠাকুর, কোনো ফরমান জারি করেছেন নাকি?  তবে যায় করুন সতী প্রথা বন্ধ রামমোহন রায় করবেই, কেউ আমায় আটকাতে পারবে না। বড়লাটও আমায় আশ্বাস দিয়েছেন এই বিষয়ে। তাই এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। “
 এবার আমার কথা প্রতিউত্তর দিতে বিধ্বস্ত পৌঢ়ের বিধ্বস্ত গলা  দিয়ে সুর বের হলো।
-” আপনার মূল্যবান সময় নষ্টের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি রাজাবাবু, সত্যই আপনার কাছে দরকারে আসা। দরকারে না পড়লে কি আর মানুষ কাউকে স্মরণ করে?  ভগবানকেও করে না। তবে এটা ঠিক যে আপনার কাছে কোনো আর্জি তোলার মুখ এই ব্রাহ্মনের নাই। কিন্তু এই আর্জি শুধু আমার নয়, এই আর্জি শত শত নিপীড়িত ভারতীয় পিতার।
তার কথা শুনে কিছু প্রশ্ন মনে উঁকি  দিলো।  সেকি? হঠাৎ কি আর্জি তার?  আর কেনই বা সে এই আর্জি নিয়ে সমাজের উপাধী দেওয়া এই কালাপাহাড় রামমোহনের কাছে এসেছে? কেন?
বললাম – “কোনো বিপদে পড়লে নিঃসংকোচে বলতে পারেন, আমি চেষ্টা করব আপনার আর্জি পূর্ণ করার। “
-” হ্যা, আপনাকেই বলব। আপনি ছাড়া এই ভূভারতে আর কারো সে ক্ষমতা নাই। শুনুন-
আমি উমাচরণ বাচস্পতি।  বাড়ি হরিপুরে।
টানাটানির সংসার রাজাবাবু। জমি বলতে শুধু বসতভিটে। যজমানি করে যা একটু পায় তাই দিয়ে দিন চলে যায় কোনো রকমে। বাড়িতে লোক বলতে আমার গিন্নি আর আমার শিবরাত্রির সলতে সতী, আমার একমাত্র মেয়ে কত্তা।”
 মেয়ের কথা বলতেই তার গলাটা ধরে এলো। কন্যায়গ্রস্থ হয়ে কি এলো আমার কাছে?  অসম্ভব নয়।  ভারতে এমন বাপের সংখ্যা ও কম না। ইনিও কি তাদের দলে?  হতেই পারে। যাগ গে, ভাবনা মাথা থেকে বাদ দিয়ে তাকে বললুম, ” জল খাবেন?  জল দেব? “
-” নাহ, থাক, লাগবো না। ঠিক আছি।
-” আচ্ছা তারপর বলুন।”
আপনি জ্ঞানী  ব্যক্তি, কন্যাদায়গ্রস্থ বাপের অবস্থা জানেন নেচ্চয়। আমার অবস্থাও তেমনই। ভাতই পায় নে, মেয়ে পার করব কিভাবে?  কিন্তু মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছে, তখন পার তো কত্তেই হবে।মেয়ে আমার সাক্ষাৎ দুগ্গা। কিন্তু পোড়াকপালি সতী মা  আমার এমন দক্ষের ঘরেই জন্ম নিলে, যার নুন আনতি পান্তা ফুরায়।  সেখানে রাজা দক্ষের মতো স্বয়ম্বর আয়োজন করে বিয়ে দেওয়া তো স্বপ্নের অতীত।  তবে গরীব হলেও, আমি তো বাপ। আমারও ইচ্ছে ছিল, খুব বড় ঘরে মেয়ের বিয়ে দেব। কিন্তু বরের দাম যে চড়া। আমার সামর্থে কুলায় না বাবু। মেয়ের বয়স ৬ পার হতে না হতেই, পাড়ার লোক- কুলীন সমাজ মেয়ের বিয়ের জন্য তাগাদা দিতে লাগলে। একঘরে করবে বলে জনরব উঠল৷ এই রূপসী মেয়ে তখন আমার গলার কাঁটা হয়ে উঠল। সমাজের লোক আর কিছু না পারুক, বিপদে মরার উপর খাড়ার ঘাঁ হয়ে দাঁড়াতে পারে ঠিকই।”
এবার তার গলায় কথা আটকে গেল। হয়ত সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি, আমার বাড়িতে সে হয়ত খাবে না। তাই বামুন বউকে দিয়ে জল আনালাম। প্রথমে নিতে ইতস্তত করলেও, পরে জল নিল। এবং এক ঢোকে গেলাস ও ফঁাকা করে  দিল।
তারপর তাকে আবার বলতে বললল সে শুরু করলে-
” উঁচু দরের পাত্রের চাহিদা পূরণে ক্ষমতা আমার ছিল না কত্তা।  কন্যাদায়গ্রস্থ এই বাপকে ভারমুক্ত করতে এগিয়ে এলো এক জনদরদী বর।  সেই বরকে জামাই বলব নাকি দাদামশাই বলব?  বয়স ৭৮ এর উপরে। অল্প  করে মেয়ে উদ্ধার করবেন। অন্য উপায় না দেখে রাজি হলুম। যথাসময়ে বিপত্নীক ও বহুপত্নীক জামাই এর সাথে অল্প খরচে আমার সতীর বিয়ে হলো। রাত পোহানোর আগেই জামাই বেড়িয়ে পড়ল অন্য এক গরীব বাপকে উদ্ধার করতে। হয়ত এটা তার ৫০ তম উদ্ধারকার্য।
বামুনের কথা শুনে ক্ষনিক থম মেরে বসে পড়লাম।  বললাম, ” মেয়েটাকে এইভাবে জলে ফেলে দিলেন? “
কাহিনীটা অতি সাধারণ। বাংলাদেশে  এইটা এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। তবুও এত কাছ থেকে শোনার পরে খারাপ লাগছে। সে বলল,” জলে না বাবু, আগুনে। জলে ফেললেও তো কথা ছিল।  কিন্তু আমার মেয়ে যে আগুনের তাপ সহ্য করতে পারত না। “
কথাটি বলে সে আর স্থির থাকতে পারল না। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল, তবে কি মেয়েটাকে?…….
তাকে শান্ত করে পুরাটা বলতে বলি।
সে বলল, ” বিয়ের বছরখানেক গত হলো। জামাই এত দিনে আর এমুখো হয়নি। সামনে পুজো। শরতের কাশফুল ভরা পথের দুধার।  আমি গেছিলুম পাশের গেরামে। সেখানে এক ধনী যজমানের বাড়িতে স্বস্তয়ন ছিল। সেখান থেকে একটা ধুতি আর লালপেড়ে সাদা শাড়ি পেলুম, আর কিছু ট্যাকা দক্ষিণে। ভাবলুম মেয়েটাকে তো কিছু দিতি পারি নে, এই শাড়িখান দিবানে। পুরান ময়লা শাড়ি পরেই মেয়েটা আমার ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।  বাড়িতে আসতে আসতে সন্ধে
 হয়ে গেল। এসে দেখলুম অনেক ভিড়, আর কান্নার রোল। বুকটা খচ করে উঠল। ঘরে ঢুকে যা শুনলুম, তারপর পায়ের তলা থেকে মাটি সরি গেল। জামাই গতকাল দেহ রাখিছে আর মরার সময় আমার মেয়েকে সতী হতি বলি গেছে।  তার সৎকার হয়ে গেছে। এখন তার ব্যবহার করা জিনিসের সাথে আমার মেয়েকে সতী হতি হবি। পাড়ার লোক ধন্যি ধন্যি কত্তি লাগল।কিন্তু আমি আর আমার বউ তো চোখে অন্ধকার দেখছি। বউ এর জ্ঞান হারানো দেখে বামনরা আমার উপর চাপ দিতি লাগল, হুমকি দিতি লাগল। আমি মেয়েকে সতী করা ছাড়া উপায় দেখলুম না। পাগলি মা আমার কিছুই জানে না। শুধু চিতার আগুন ধরানোর পর আমারে বললে, ” বাবামশাই, আগুনের অনেক তাপ। সহ্য হয় না, নিয়ে চলেন এখান থেকে আমাকে। “
সে আর পারল না বলতে। মাটিতে বসে পড়ল। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ” বিশ্বাস করেন, মেয়েটাকে কখনো রান্নাঘরে যেতে দেয়নি, আগুনের তাপ লাগবে বলে, আর সেই মেয়েকে এই দুহাতে আমি চিতাতে ছুড়ে ফেলেছি।এমন অক্ষম বাপ আমি। “
সে আর কিছু বলার অবস্থায় থাকলো না, আমার কপোলেও জলের অস্তিত্ব টের পেলুম। আমার বৌঠানের কথা স্মরনে এলো। আমার মাতৃসম বৌঠানকেও তো বাঁচাতে পারিনি।  আমিও কি পারবো, এই বাপের আর্জি রাখতে?
অংকন বিশ্বাস
১ম বর্ষ, (২০২২-২০২৩)
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial