ঢাকাশুক্রবার , ২০ অক্টোবর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

কলেজে একদিন

জুবায়ের আহমেদ
অক্টোবর ২০, ২০২৩ ৮:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আল আমীন আজহার
একসময় জীবনের একটা বড় সাধ ছিল কলেজে পড়া। তখন আমার নিষ্ক্রিয় চিন্তাধারায় কলেজের লাইফস্টাইল ধরা দিয়েছিল- অপ্সরা কোন ষোড়শী তরুণীর প্রথমবার হাত ধরে ভালোবাসি বলার মতই আবেগঘন এবং মেঘাচ্ছন্ন হয়ে। ভাবগম্ভীর শিক্ষানবিশ প্রভাষকদের সাবলীল বাচনভঙ্গি অনুপম অঙ্গভঙ্গি এবং মনোমুগ্ধকর আলোচনা, শিক্ষার্থীদের রঙিন লাইফস্টাইল, কলেজের বিশাল বড় বড় বিল্ডিং, বর্ণিল শিক্ষা কারিকুলামের বিশাল ভলিউমের মোটা মোটা বই; বন্ধুদের কাছে এসবের বয়ান শুনে শুনে কলেজের প্রতি আবেগ এবং ভালোবাসা দিনদিন বেড়েই চলছিল। নাটক সিনেমায় কলেজ লাইফের গভীর প্রেম উপাখ্যান দেখে তো খেই হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছে বহুবার। নাকের ডগায় ঝুলানো চশমার নিচ দিয়ে কেরানীদের অনুসন্ধিৎসু চাহনিও আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করেছিল।
অবশেষে একদিন যুগ যুগান্তরে সঞ্চিত প্রেম, অনিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা এবং যে অজস্র কল্লোল ঢেউ তুলেছিল হৃদয়ের আঙিনায় তা নিয়ে হাজির হলাম কলেজে। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম একজন প্রভাষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন। বেগুনি কালারের একটা ডিস্কো পাঞ্জাবির সাথে ম্যাচিং করে সাদা পায়জামা পড়েছেন। মুখ ভর্তি দাড়ি। মাথায় সুন্দর একটা টুপিও আছে। পায়ে সু-মোজার পরিবর্তে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। পানের রসে মুখ লাল হয়ে আছে। গ্রাম্য ভাষায় লেকচার দিচ্ছেন। কয়েকটি ছেলে ম্লান মুখে বসে বসে স্যারের লেকচার শুনছে। উন্মাদের উন্মাদনা থেমে গেলে যেমন ক্লান্ত হয়ে বিমর্ষ চেহারায় নিজেকে ভুলে বসে থাকে পঁচে যাওয়া খাবারের অপেক্ষায় তেমনি ছেলেগুলো অপেক্ষা করছে ক্লাস শেষ করে কোচিং সেন্টারে যাওয়ার জন্য। কয়েকটা মেয়ে স্যারের দিকে ফেলফেল করে তাকিয়ে আছে। যেন আগে কোনদিন কেউ এমন লেকচার শুনেনি। তাদের গায়ে কালো বোরকা। হিজাবে ঢাকা চেহারা। দেখে মনে হচ্ছে কোন মহিলা মাদ্রাসার ছাত্রী। নিরব নিস্তব্ধ ক্লাসরুম। কেবল জোর গলায় শোনা যাচ্ছে স্যারের লেকচার।
অন্যদের মতো করে গেটে দাঁড়িয়ে আমিও স্যারের কাছে ক্লাসে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম – স্যার আসতে পারি? আমার কণ্ঠ শুনে সবাই হকচকিয়ে উঠলো; এ আবার কোত্থেকে এলো; আগে তো কখনো দেখলাম না কলেজের ত্রি-সীমানায়! স্যার অনুমতি দিলেন। তাড়াতাড়ি এসো, অনেক দেরি হয়ে গেল তো, সামনে থেকে আরো সময় নিয়ে আসতে হবে- ফ্রি ফ্রি কয়েকটি উপদেশও দিলেন। জি স্যার বলে ক্লাসে প্রবেশ করলাম। একেবারে শেষ বেঞ্চে গিয়ে বসলাম ফোর্থ জেনারেশনের ব্যাকবেঞ্চার স্টুডেন্টদের মতো।
সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সব মনোযোগ কেবল আমার উপর। যেন বহুদিন পর চিড়িয়াখানার কোন পরেন্দা দেখার খায়েশ পূরণ হচ্ছে কিংবা গারদ থেকে পালিয়ে আসা কোন ভদ্রলোককে সসম্মানে গারদে ফেরত পাঠানোর জন্য নজরদারি করা হচ্ছে। তাদের এই অনুসন্ধানী চাহনি দেখে মনে মনে আনন্দিত হচ্ছিলাম – হয়তো এরা আমার চেহারার সুদর্শনে খেই হারিয়ে ফেলেছে কিংবা অতিদামি শার্ট প্যান্ট টাই দেখে বড়লোক ভেবে গলা শুকিয়ে ফেলেছে। হতেও তো পারে এমন। হঠাৎ মনে হল- আরে আমি তো সুদর্শন ফুটফুটে কোন স্মার্ট বয় নই। শীর্ণকায় কালো কুৎসিত চেহারার গরীব মৌলভী মানুষ। গায়ে পাঞ্জাবি পরনে পাজামা মাথায় টুপি মুখভর্তি দাড়ি ইয়া বড় গোঁফ- সাক্ষাৎ কোন দরবেশ কিংবা প্রাচীন কালের ধুরন্ধর কোন জ্যোতিষ। কলেজের উদ্যাম আঙিনায় এমন দরবেশ কিংবা জ্যোতিশের আকস্মিক আবির্ভাবে সবার ঘাবড়ে যাওয়া কিংবা দৈত্য-দানব ভেবে আতংকে চিৎকার করে উঠাও  অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না।
আমি ধ্যান মন দিয়ে একাগ্রচিত্তে স্যারের লেকচার শুনছি। ইংলিশ পড়াচ্ছেন। ১৯৬৩ সালের ২৩ শে অগাস্ট বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আড়াই লক্ষ আমেরিকানের এক বিশাল সমাবেশে ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ নামে যে মশহুর লেকচার দিয়েছিলেন একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ইংলিশ বই থেকে স্যার তা পড়ে শুনাচ্ছেন। লুথার কিং কিভাবে আমেরিকান দেশকে সভ্যতার সবক শিখিয়েছেন,  বর্ণবাদের অভিশপ্ত অহংকার থেকে মুক্ত করে সাদা কালো মানুষের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেছেন সেই ইতিহাসের বয়ান দিচ্ছেন। আমি অপলক নেত্রে স্যারের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে লুথার কিংয়ের সেই ঐতিহাসিক বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বয়ান শুনছি। স্যারের শব্দচয়নের মাধুর্য সাবলীল বাচনভঙ্গি অনুপম অঙ্গভঙ্গি এবং মনোমুগ্ধকর আলোচনায় লুথার কিংয়ের সেই তেজোদীপ্ত উচ্চস্বর অনুভব করছি। সেই মুগ্ধতার রেশ এখনো কাটেনি।
দীর্ঘ সময় পর বাঁ দিকে ফিরে তাকালাম। এতোক্ষণে সবার মনোযোগ পুনরায় স্যারের দিকে ফিরে গেছে। ওই পাশটায় মেয়েদের আসন। একটি মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অপূর্ব সুন্দরী সে। কি মায়াবী তার চাহনি! মুখটা গোলাকার। ঠোঁট দুটো গোলাপের পাঁপড়ির মতো- টকটকে লালও নয়, আবার কিছু কমও নয়। কাজল কালো চোখ। এত নীল সে দু-চোখের মণি, মনে হয় যেন আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল এক হয়েও হারাতে পারবে না সেই গাঢ়ত্বকে। ধনুকের মতো বাঁকানো তার ভ্রু। ভ্রমরের ডানার মতো লম্বা বাঁকা পাঁপড়িগুলো মায়াময় চোখগুলোকে পাহারা দিচ্ছে সুদক্ষ প্রহরীর মত। কচি লাউয়ের ডগার মতো সরু লম্বা নাক। দাঁতগুলো মুক্তার দানার মতো; হাসলে মনে হয় মুগ্ধতার এক শুভ্র কাশবন। মনে হচ্ছে- টলেমীয় মিসরের রাণী ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্য তার সৌন্দর্যের কাছে ম্লান হয়ে যাবে। আমার দৃষ্টির সীমা অব্দি তার সৌন্দর্য ছেয়ে আছে। কিন্তু সে আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? জানি না।
এই অপূর্ব সুন্দরী ষোড়শী তরুনীর সৌন্দর্যেই থমকে গেছে আমার তন ও মন। তার অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কখন যে ক্লাস শেষ করে প্রভাষক ক্লাসরুম ত্যাগ করেছেন সে খেয়াল নেই। ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে বারান্দায় গিয়ে একটি ছেলে বিড়ি ধরিয়েছে। আকিজ বিড়ি। মনের সুখে বিড়ি টানছে আর নষ্ট ইঞ্জিনের মতো নাক দিয়ে গড়গড়া ধুঁয়া ছড়াচ্ছে। পাশেই একজন গলা ছেড়ে দিয়ে ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গান গাইছে। আরো দুয়েকজন তার পাশে ভিড় করছে বিড়িতে একটা সুখটান দেওয়ার জন্য। বিড়ি টানার সে কি অভিনব টেকনোলজি তাদের। ঠিক গল্প উপন্যাসের রাজাদের মতো।
হঠাৎ অপূর্ব সেই ষোড়শীর অনভিপ্রেত, আচমকা, বেঢপ, কিম্ভুত ও বজ্রপাতের মতো ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বরে আমার মতি ফিরে আসে। ‘এই ছেলে তোমার নাম কী?’ কি কর্কশ গলার আওয়াজ! বসন্তকালের ভর দুপুরে শিমুল গাছের ছায়ায় ঘুমের ঘোরে হঠাৎ কাকের কাকা শুরু হলে নিজেকে যেমন অসহায় মনে হয় তার কর্কশ কন্ঠের সামনে নিজেকে তেমনই অসহায় মনে হল। কিছুক্ষণ থেমে থেকে আবারো একই প্রশ্ন – এই ছেলে নাম কী তোমার? তার এই নির্দয় প্রশ্নে- ফাটা বাঁশের চিপায় অণ্ডকোষ আটকে দিয়ে উল্টো ঝুলিয়ে জেলখানায় কয়েদিকে শাস্তি দেওয়া হয় যে গুরুতর অপরাধের দায়ে; নিজেকে কেবল তেমন এক অপরাধে জড়িত মস্তবড় অপরাধী হিসেবে আবিষ্কার করলাম। আমি কেবল ভাবছিলাম – এমন একটা মেয়ে যদি জীবনে আসে তাহলে ভবিষ্যত ফকফকা হতে বেশিদিন সময় লাগবে না।
ক্রমশঃ তার আসল চরিত্র প্রকাশ পেতে থাকলো। আর মুহূর্তের মধ্যেই আমার কল্পনার রাজ্যে কল্পিত তার সকল সৌন্দর্য ম্লান হয়ে গেল। তার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে না পেরে আমি  তীব্র অসন্তোষ, অসম্মতি ও ঘৃণা নিয়ে কলেজের এই কমিউনিটি ত্যাগ করলাম। আমার কলেজে পড়ার সাধ মিটে গেছে! বস্তুত কলেজের পড়াশোনা এবং রঙিন লাইফস্টাইল বাস্তবের চেয়ে কল্পনাতেই অনেক বেশি সুন্দর।
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial