ঢাকাবুধবার , ৪ অক্টোবর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

বই রিভিউ-“শাপমোচন”

শামীমা আক্তার
অক্টোবর ৪, ২০২৩ ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

প্রেমের উপন্যাস পড়তে যারা পছন্দ করেন,তাদের জন্য ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের “শাপমোচন” বইটি মাস্ট রিড বইয়ের মধ্যে পড়ে।ঔপন্যাসিক এত সুন্দর ও মনোরমভাবে উপন্যাসটি লিখেছেন যে পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাঠক উঠতে পারবেন না।উপন্যাসটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে মূলত নায়ক মহেন্দ্র,তার ভাই দেবেন্দ্র, ভাইপো খোকন, বৌদি অপর্ণা, নায়িকা মাধুরী,তার পিতা উমেশচন্দ্র, তিন ভাই- অতীন,যতীন,রথীন ও তাদের স্ত্রী ,মাধুরীকে বিয়ে করতে চাওয়া কুমার,সুশীল ও বরুণসহ আরো অনেক অপ্রধান চরিত্রকে কেন্দ্র করে।

কাহিনি সংক্ষেপঃ
উপন্যাসের শুরু হয় শারদীয়া পূজা ও উপন্যাসের নায়ক মহেন্দ্রের কলকাতা গমনের পূর্বাভাস দিয়ে।মহেন্দ্র তার অন্ধ দাদা দেবেন্দ্র, অসুস্থ বৌদি আর অতি আদরের ভাইপো খোকনকে নিয়ে অতিশয় দীন অবস্থায় জীবন-যাপন করছে।অসুস্থ ভাইপোর আবদার পূরণের নিমিত্তে মহেন্দ্র এই দারিদ্র্য অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য, চাকরির আশায় কলকাতায় তার পিতৃবন্ধু,অতিশয় ধনী উমেশবাবুর কাছে যায়।এককালে উমেশবাবুর কঠিন সময়ে মহেন্দ্রের পিতা জীবন বাজি রেখে তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন।উমেশবাবু মহেন্দ্রকে পুত্রসম স্নেহে আশ্রয় দেন এবং এতকাল ধরে বন্ধু বা তার পরিবারের কারো কোনো খোঁজ নেননি বলে আক্ষেপ করেন। এই আক্ষেপ থেকেই তিনি প্রতি মাসে ৫০ টাকা মানিঅর্ডার করতেন,যা মহেন্দ্রের ভাই দেবেন্দ্র গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করলেও নিতান্ত অন্ধত্বের কারণে অন্যের দান গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে দরিদ্রতার মধ্যে বড় হওয়া মহেন্দ্র রাজপ্রাসাদের মতো সুবিশাল বাড়িতে এসে হীনমন্যতায় ভোগে এবং সে বুঝতে পারে যে বৃদ্ধ উমেশবাবু ছাড়া বাকি সবাই তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখছে।এরই মধ্যে আর্বিভাব ঘটে উমেশবাবুর রুপবতী ও কুমারি একমাত্র মেয়ে,উপন্যাসের নায়িকা মাধুরীর।বিশাল বাড়ির অপরিচিত মানুষদের মধ্যে মাধুরী হয়ে ওঠে মহেন্দ্রের জন্য একমাত্র স্বস্তির নিঃশ্বাস,ভালো বন্ধু।বাড়ির সকলের মধ্যে থেকেও মাধুরী ব্যতিক্রম।ধনীর একমাত্র দুলালি ও তিন ভাইয়ের চোখের মণি হওয়া স্বত্বেও বড়লোকের তথাকথিত সোসাইটিকে ছাড়িয়ে সে জানে মানুষকে কিভাবে সম্মান করতে হয়,জানে আতিশয্যের মধ্যে থেকেও কিভাবে সর্বস্তরের মানুষকে ভালোবাসা যায়।

মহেন্দ্রকে দেখভাল করার দায়িত্ব এক প্রকার মাধুরীই নিয়ে নেয়।মাধুরীর সংস্পর্শে থেকে মহেন্দ্র ধীরে ধীরে সোসাইটির আদব-কায়দা শিখে যায়।মহেন্দ্রকে নিয়ে মাধুরী সঙ্গীতালয় থেকে শুরু করে কলকাতার নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়।সংগীত, সাহিত্য সহ সবক্ষেত্রে মহেন্দ্রের পারদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে কখন যে মাধুরি মহেন্দ্রকে ভালোবেসে ফেলে,নিজেই বুঝতে পারেনা।কিন্তু মহেন্দ্র তার কলকাতায় আসার কারণ সম্পর্কে অবহিত ছিল।আর সে ভালোই বুঝতে পেরেছিল যে উমেশবাবুর দানের টাকা তার অন্ধ দাদা গ্রহণ করছিলেন নিতান্ত বাধ্য হয়ে।তাই সে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির আবেদন শুরু করার পাশাপাশি পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন।লেখালেখি থেকে পাওয়া প্রথম উপার্জনের ১৪ টাকা গ্রামে তার পথ চেয়ে বসে থাকা অন্ধ দাদা,অসুস্থ বৌদি ও শিশুদেব হিসেবে মেনে আসা প্রিয় ভাইপোর জন্য পাঠাতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং সুদূর কলকাতা থেকেই বুঝতে পারে যে এই অল্প টাকাই তার অন্ধ দাদার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু হয়ে ওঠবে।

এরই মধ্যে ৬০ টাকা বেতনে সওদাগরী অফিসে কেরানি পদে মহেন্দ্র একটা চাকরি পেয়ে যায় এবং সে উমেশবাবুর বাড়ি ছেড়ে মেসে উঠতে চাইলে প্রথমে সবাই তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও পরে তার অন্যের আশ্রয়ে না থাকার বলিষ্ঠ উদ্যোগ দেখে কেউ আর বাঁধা দিতে সাহস পায় না।বরং মাধুরীই তার জিনিসপত্র গুছিয়ে দেই।
কিন্তু প্রতি সপ্তাহে শনি ও রবিবার আসলেই মাধুরী চলে আসে তার মহীনদার মেসে।সুন্দর করে গুছিয়ে দেয় ঘরটা।একসাথে কলকাতার অলি-গলি ঘুরে বেড়ায়।যখন মাধুরী জানতে পারলো যে মহেন্দ্রের গানের গলা অসাধারণ,তখন সে তার নিজের সেতারটা মহেন্দ্রের ঘরে রেখে যায়।এভাবে একে অপরের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে মহেন্দ্র যেমন মাধুরীর চোখে দেখেছিল মাতৃরূপের ছায়া,তেমনি ছোট্ট ভাইপো খোকনের প্রতি মহেন্দ্রের অকাতর ভালোবাসা,অর্থাভাবে যে খোকন না খেয়ে থাকে,তার জন্য মহেন্দ্রের মনোকষ্ট মাধুরীকে মোহিত করে।এভাবে দুজনের অজান্তেই দুজন দুজনকে ভালোবেসে ফেলে।কিন্তু মহেন্দ্র নিজের অবস্থানের কথা চিন্তা করে মনে করে এটা তার ছল।সে চায় মাধুরি রাজরানি হোক_আর তার সাথে থাকলে এটা কখনো হবে না।তাই তো “মাছরাঙা মাছের শত্রু,মাধুরী”_এ কথা বলে কৌশলে সে মাধুরীকে প্রত্যাখান করে এবং একদিন কাউকে কিছু না জানিয়েই নিরুদ্দেশ হয়ে যায় এবং নিরুদ্দেশে যাওয়ার আগে সে তার বৌদির পাঠানো শেষ চিঠি_যেখানে তার বিয়ের ব্যাপারে পাত্রী দেখার ব্যাপারে লিখা ছিল,সেটি বাক্সে ফেলে যায়।

 

এরপরে উপন্যাসের কাহিনিটা এমনভাবে বর্ণনা করা যা পড়ে যেকোনো পাঠকের চোখ থেকে পানি ঝরবে।
দীর্ঘদিন মহেন্দ্রের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় মাধুরী তার মেসে খোঁজ নিতে এসে জানতে পারে সে কোনো ঠিকানা না জানিয়েই এখান থেকে চলে গেছে এবং বাক্সে অনেকগুলা চিঠি জমা হয়ে আছে।চিঠি পড়ে মাধুরীথ জানতে পারে মহেন্দ্রের বিয়ের ব্যাপারে।সে ভাবে মহেন্দ্রের অকস্মাৎ নিরুদ্দেশ হওয়ার কারণ হয়তো এই চিঠি_সে হয়তো তাকে বিয়ে করতে পারবে না বলে লজ্জায় কিছু না বলেই নিরুদ্দেশ হয়েছে বা হয়তো অন্ধ দাদার সম্মান রক্ষার জন্য বদ্ধপ্রতিজ্ঞ ছিল বলে এমনটা করেছে।কিন্তু সে যে মহেন্দ্রকে ভালোবাসে।ভাই-বৌদিরা প্রথমে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য জোর করলেও পরে আর বাঁধা দেয় না।মাধুরী মহেন্দ্রের জীবনাদর্শনকে পুঁজি করে ব্রজধাম খোলে এবং আর্থসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে।
অন্যদিকে দেখা যায় মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় মহেন্দ্র বাড়ি ফিরেছে_তার জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে।মাধুরীর সেতারটাই তার কাছে মাধুরীর শেষ স্মৃতিচিহ্ন। দশমীর দিন ঠিকানাহীন নীল রঙা খামে মহেন্দ্রের কাছে একটা চিঠি আসে_হ্যাঁ মাধুরীর চিঠি।চিঠি পড়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে সেতারের সুরের মূর্চনায়,অতঃপর মহেন্দ্র পৃথিবী ত্যাগ করে।ওদিকে অভাগী মাধুরী, তার কাছে থাকা মহেন্দ্রের একটা ফটোকে পতিসম পূজা করে মালা পরিয়ে দেয়।
প্রতি দশমীতে মাধুরী মহেন্দ্রের বাড়ির ঠিকানায় নীল রঙা খামে একটি করে ঠিকানাহীন চিঠি পাঠায়। একের পর এক দশমী যায়, আট বছরের খোকন ষোল বছরের হয়,মহেন্দ্রের বাড়িতে এক এক করে নয়টা চিঠি জমা হয়।কিন্তু মাধুরী কখনো চিঠির উত্তর পায় না৷ মহেন্দ্রের আশায় মাধুরী অপেক্ষা করে, আবার দেখা হবে বিশ্বাস করে প্রতীক্ষায় থাকে, অথচ মাধুর মহীনদা যে কবেই মুছে গেছে সে তা জানে না৷ কখনো জানবেও না!

নিজস্ব মতামতঃ
উপন্যাসটিতে চরম দরিদ্রতা ও চরম উচ্চবিলাসিতার সংমিশ্রণের সাথে পারিবারিক দায়িত্ব -কর্তব্য,ভালোবাসা যেমন ফুটে ওঠেছে, তেমনি দুটি মানুষের মধ্যে আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও আত্মিক প্রণয়ের মিশ্রণে অসাধারণ এক সৃষ্টি ফুটে ওঠেছে। বইটির প্রতিটি চরিত্র এতে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা পাঠকের কাছে কখনো বিরক্তিকর হয়ে ওঠে না ।ঔপন্যাসিক গল্পের কাহিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে মহেন্দ্রের মাধুরীকে প্রত্যাখান করার পরও মহেন্দ্রর উপর পাঠকের বিরক্তি আসবে না৷ পাঠের শেষে গিয়ে পাঠক তৃপ্তি -অতৃপ্তির বার বার পাতা উল্টাতে হবে কয় পাতা বাকি আছে দেখার জন্য, শেষটা কেমন হবে

মনে দাগ কাটা উক্তিঃ
“”গোধূলি কিন্তু বিয়ের লগ্ন,সঙ্গে সাথী দরকার,জানাল সুশীল।
না,শুধু বিয়ের কথা ভেবেছেন দেখছি_গোধূলি বিরহেরও লগ্ন,পৃথিবীর বিরহ,আকাশে বিরহ,এই সন্ধ্যারাগ বিরহেরও মহাকাব্য! ”

“_ দীনভাব আমি ভালোবাসি না!
_কিন্তু আমি দীন..
_ না,মাধুরি তীব্র প্রতিবাদ জানালো-নিজেকে দীন মনে করা অপরাধ। মানুষ অমৃতের পুত্র। দীন কেন হবে?”

“জীবন থেকে কাব্য জন্মায়,কাব্য থেকে জীবন জন্মায় না।কবিতা জীবনে ভোজ্য,জীবন তো কবিতার ভোজ্য নয়,মাধুরী!”

“মহেন্দ্র গভীর নিশীথে সেতারটা কোলে নিয়ে বসে ভাবে,কতদূর আজ সেতারের অধিকারিণী।বর্ষার আকাশ আর্দ্র করে মহেন্দ্র কণ্ঠ থেকে করুণ রাগিণী ঝঙ্কার তোলে__সে কথা কি গেছে ভুলে? ” 

নাম: শামীমা আক্তার
শ্রেণি: স্নাতক ৩য় বর্ষ,৫ম সেমিস্টার।
প্রতিষ্ঠান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিভাগ: ইতিহাস
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial