ঢাকাবুধবার , ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য
  1. আইন
  2. ইতিহাস
  3. ইসলামী সঙ্গীতের লিরিক্স
  4. কবিতা
  5. কিংবদন্তী কবিদের কবিতা
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলাধুলা
  8. গল্প
  9. চিঠিপত্র
  10. জনপ্রিয় বাংলা গানের লিরিক্স
  11. তারুণ্যের কথা
  12. ধর্ম
  13. প্রবন্ধ
  14. প্রযুক্তি
  15. ফিচার

আলোকিত কুরআনের মহিমা

আতিক উল্লাহ আল মাসউদ 
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৩ ১২:৫৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জ্যোতি নেই কোথাও। কেবলই থইথই বর্বরতা, কেবলই থকথকে অন্ধকার। তিমিরাচ্ছন্ন ঘনীভূত অন্ধকার চেয়ে গেছে ধরিত্রীর চতুষ্কোণে। মানবজাতি পার করছে অন্ধকার পঙ্কিল যুগ। সে মাহেন্দ্রক্ষণে মক্কার কোন এক জানালার ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে এমন এক সুরভিত আলো ঝলমল করেছিল যার প্রতিফলনে যুগের তামিস্রা মুহুর্তের মধ্যে পকপকে আলোকিত হয়েছিল। আধার কেটে নতুন সূর্যের উদয় হলো। ঘন আঁধারের মাঝে বিদ্যুৎ চমকিয়ে মানবতার বসন্ত শুরু হলো। সে সূর্য ও বসন্তের রাঙা ফুলের নামই হলো আলোকিত কুরআন।

মরুর কেন্দ্রে মক্কা হতে দুই মাইল দুরে দুর্গম পাহাড় মাড়িয়ে হেরা গুহায় চলে যান জাতির পাঞ্জেরি মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।    দীর্ঘদিন ধ্যানে মগ্ন থাকার পর ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে হেরা গুহা ঐশ্বরিক আলোতে উদ্ভাসিত হলো। অতঃপর শুরু হলো মানবতার ঊষার আলো। পৃথিবীর বুকে সুবহে সাদিকের আভা ফুটে উঠলো। জ্যোতির এই মোহনায় আঁধারের অবসান ঘটতে শুরু হলো। বিচ্ছুরিত এই আলোতে মক্কার প্রত্যেক গোত্র অনাচার, অশালীন ও মরণপীড়া থেকে পরিত্রাণের বার্তা পেল। সে অমিয় বার্তার ঝলকটি হলো পবিত্র কুরআন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আমি শেষনবী মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছি এজন্য যে, যাতে করে মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে বাহির করে আলোর দিকে নিয়ে আসতে পারি।  সুরা ইব্রাহিম :০১

শুরু হলো সে আলোর শক্তি ও আকর্ষণের চূড়ান্ত প্রতিফলন। এই আলোর এক রশ্মি বীরকেশরী আলির অন্তরে জাগরিত হলো ফলত আলির হৃদয় ইসলাম কবুলের জন্য ব্যাকুল হয়ে গেল। একপর্যায়ে কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী তেজস্বী নেতাদের উপস্থিতিতে ভোজনকালে মুহাম্মদ (সা:) এর উপর আলোকিত কুরআনকে দ্বিধাহীনভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবু বকর (রা:) কুরআনের সবক পেয়ে নবিজির চিরদিনের সাথী হতে পেরেছেন। কুরআনের এই আলো আউস ও খাজরাজ গোত্রে প্রতিফলিত হলো অবশেষে আউস ও খাজরাজের অর্থনীতি প্রাচুর্যতায় ভরে গেল। অসংখ্য নৃপতি ও জনসাধারণের কর্ণে সুললিত কুরআনের ধ্বনি পৌঁছালো অতঃপর তারা অন্ধকারের বধ্যভূমি থেকে আলোকিত সভ্যতায় নামখানা লিপিবদ্ধ করেছে। ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে আলোকিত সমাজ গঠনের জন্য রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ষোলোজন নওমুসলিমকে বর্তমান ইথিওপিয়ায় পাঠালেন অতঃপর খ্রিস্টান শাসক নাজ্জাসীর হৃদয়ে কুরআনের সুরভিত ঘ্রাণ বদ্ধমূল হলো। যার ফলে তিনি অন্ধকারে চশমা আবৃত মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি আলোকিত এই মানুষদেরকে আমার রাজ্যে নিরাপত্তার সাথে বসবাসের বন্দোবস্ত নিশ্চিত করলাম। আমার রাজ্যে অন্ধের তিলক থাকতে পারে না। মক্কায় নিভু-নিভু প্রদীপ ঝলসানোর সময় কিছু নরপশু অন্ধকারের বিপণি খোলে বসেন। ফলত তারা আকাশের সূর্যকে মেঘ দিয়ে ঢাকা দিতে চেয়েছে। ফলশ্রুতিতে রাসুলুল্লাহ (সা:) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় আলোর বাতি নিয়ে হিজরত করেন। তাদের দুরভিসন্ধির অপারগতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তারা আল্লাহর জ্যোতিকে তাদের মুখ দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর জ্যোতিকে পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করবেন; যদিও অবিশ্বাসীরা তা অপছন্দ করে। সুরা আস-সাফ: ০৮
মদিনাকে পরিণত করা হলো কুরআনের উর্বর উন্মুক্ত ময়দান। মহানবী (সা:) যখন মদিনায় পা রাখলেন তখন মক্কার এই জ্যোতির প্রভাবে মদিনার প্রতিটি ঘর আনন্দে উদ্ভাসিত হয়েছে। মদিনার জনগণের হৃদয় খুশিতে টইটম্বুর হয়েছে।
নবুওয়তের ষষ্ঠ বছরে আরবের প্রভাবশালী নেতা মুশরিক সর্দার উমরের কর্ণে  সুরা হাক্কার সুর লহরি প্রবাহিত হলো অতঃপর উমরের কুৎসিত হৃদয়ে শুভ্রতার নহর বয়ে গেল। আসমানী এই আলো যেখানে পৌঁছেছে তার মানচিত্রের দৃশ্যপট পরিবর্তন করে দিয়েছে। দীপ্তিময় আলোক রশ্মি তায়েফের নাখলা প্রান্তরে উচ্চারিত হলো কার্যত অদৃশ্য জ্বীনজাতি সাক্ষ্য প্রদান করল এই সুর আসমানী ঝংকার আমরা প্রত্যক্ষদর্শী এবং এই আলো অদ্বিতীয় পরম সত্তার। সুরা জ্বীন: ০২

কুরআনের ভাস্বর দ্যুতি মক্কার একক কর্তৃত্ববাদী মুশরিক নেতা আবু সুফিয়ানের চর্মচক্ষুতে তাপিত হয়েছিল ফলশ্রুতিতে পাষাণ এই নেতা পুষ্প কোমল হয়ে গেল। আব্বাস (রা:) তাকে বললেন, মহাসত্যের উদ্ভাসিত আলোর সামনে দাঁড়িয়ে এখনও কি আপনি চক্ষু বন্ধ করে রাখবেন? নয়নজুড়ানো প্রশান্তিকর যুদ্ধের সমরনীতি অবলোকন করে আবু সুফিয়ান বুঝতে পারলেন মুহাম্মদ যে  আলো দিয়ে পৃথিবীকে দেখে এটি সূর্যের চেয়েও অধিক আলোতে বিকশিত।  মক্কা বিজয়ের সন্ধিক্ষণে তিনি কুরআনের আয়নায় পৃথিবীর আলোতে বাসগৃহ নির্মাণ করলেন।
ইতিহাসের অজেয় বীরকৌশলী যত সমরনায়ক রয়েছে তন্মধ্যে খালেদ বিন ওয়ালিদ হলেন মহানয়কের উত্তরাধিকারী। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে রাসুল (সা:) মক্কার মুশরিকদের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন যেটি ইসলামের ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। এই সন্ধির কিছুকাল পর হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা:) শান্তির শাশ্বত বাণী কুরআনের জ্যোতিতে কলঙ্কিত জীবনকে অলঙ্কৃত করেছে। তার দুই বছর পর ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে দিগন্ত বিস্তৃত এক আলোর মশাল জ্বালানো হয়েছে। যার সরলরেখা দেখে তৎকালীন মক্কার মুশরিকরা দলে দলে ইসলামে দাখিল হোন৷ এবং চিরদিনের জন্য তারা আলোর পথের সহযাত্রী হয়ে গেলেন। এভাবে করে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে পৃথিবী থেকে অন্ধের প্রলেপ সরিয়ে বিদায় হজ্জের মাধ্যমে অনন্ত কালের জন্য এক দীপ্তিমাখা শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছেন। যে মহীরুহ ছড়িয়ে গিয়েছে পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি মাটিতে। পরিশিষ্ট বর্ণনায় আল্লাহ বলেছেন, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি। সুরা মায়েদা:০৩

মক্কার জ্যোতি মুহাম্মদ (সা:) ঐশ্বরিক ধ্রুপদী ঝলঝল প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে ইহকাল ত্যাগ করেছেন। তৎপরি রেখে গেছে বহুমাত্রিক দ্যুতিময় উপখ্যান। ইতিহাসের সুবিশাল পাতায় আলোকিত কুরআনের গৌরবোজ্জ্বল রাজ্য জয়ের মহাসম্মেলন আমরা দেখতে পায়। রাসুলের বিদায়ের ত্রিশ বছরের মধ্যে কুরআনের প্রস্ফুটিত রূপায়ণ বাস্তবায়িত হয়। ৬৩২ থেকে ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইসলাম মক্কা, মদিনার গন্ডি পার হয়ে বহি:বিশ্বে পৌঁছে যায়। রাসুলের জন্মলগ্নে মা আমেনা সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত ঝলসানো নুরের আভা দেখতে পেয়েছিলেন। যার জৌলুস প্রভাবিত হয়েছে উমর (রা:) এর শাসনামলে। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে রোম সাম্রাজ্য কুরআনের আলোয়ে ভাস্বর হয়েছে। পরবর্তী উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনামলে ইসলাম তার পরিপূর্ণ উৎকর্ষতা নিয়ে হাজির হয়। একদিকে সাম্রাজ্য জয় অন্যদিকে কুরআনকে জ্ঞানভান্ডার ধরে বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের জয়জয়কার পৃথিবী কায়েম করেছে। তারা আসমানী গ্রন্থকে জগৎ জীবনের সমস্যার সমাধান হিসেবে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল। যার ফলে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রত্যেক শাখা আল জাজারি, আল বাত্তানি, আল রাজি, ইদরিসি, হাইসামি ও ইবনে সিনাদের জ্ঞানের নিকট ঋণী হয়ে আছে। তাঁরা অধুনা বিশ্বের ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন। এঁদের প্রত্যেকের উৎস গ্রন্থ ছিল মহাগ্রন্থ আল কুরআন। একইসাথে উমাইয়া যুগে অষ্টম শতকে স্পেন থেকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত কুরআনের প্রচারের মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিজয় নিশ্চিত করেছে। এই বিজয়ের ধারা নীলনদ থেকে অক্সাস নদী পর্যন্ত বহমান থাকে। কুরআনকে হৃদয়ে ধারণ করলে হৃদয়কে আন্দোলিত করবে, রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন করলে শান্তির কানন তৈরি হবে। রাসুল (সা:) বলেন,  নিশ্চয় যারা কুরআনকে মর্যাদা দিবে আল্লাহ তাদেরকে সমুন্নত জাতিতে পরিণত করবে। (সহিহ মুসলিম)

অন্ধকারের রাত্রি পার করে কুরআনের মাধ্যমে সমুজ্জ্বল প্রভাতের ফয়দা হয়। পৃথিবীর অনাচারকে বশিভূত করতে কুরআনের আবেদন অপরিসীম। জাহেলিয়াতের সময়কাল পৃথিবীর ইতিহাসে বহুবার আগমন করেছে তৎপরি কুরআনের মাধ্যমে স্বর্গীয় কানন তৈরি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে উপমহাদেশে শ্রেণিবৈষম্যতাকে  মুসলিম আগমনের মাধ্যমে জ্বলন্ত কুরআন দ্বারা দাফন করে হয়েছিল। এভাবে করে বিশ্বব্যাপি নানা অনাচার, অন্ধকার কদর্য এবং বিভৎস চরিত্রকে কুরআনের ডগায় আলোকিত বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পরিশেষে, কুরআনের চূড়ান্ত নিবেদনে আমাদেরকে আলোকিত স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তহলেই সকল যাতনার নাভিশ্বাস জীবাণু থেকে মানবজাতি মানবতা, অধিকার, অঙ্গিকার ও সমতার ফল্গুধারা ফিরিয়ে পাবে। বিশ্ব আবারো কুরআনের এক অসাম্প্রদায়িক সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে হাজির হবে। ইনশাআল্লাহ

লেখক, আতিক উল্লাহ আল মাসউদ
তরুণ লেখক ও গবেষক
Please follow and like us:

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial